প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হাওরাঞ্চলের শিশুদের জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেছেন, দেশের দুর্গম ও পিছিয়ে থাকা হাওরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে বাস্তবভিত্তিক সমাধান গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তা, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে সরকার এসব অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে সুনামগঞ্জ প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই)-এ আয়োজিত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি হাওরাঞ্চলের শিক্ষার সার্বিক উন্নয়ন, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষক সংকট, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় হাওরাঞ্চলের বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘ সময় পানি থাকায় বিদ্যালয়ে যাতায়াত, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা অনেক ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। তিনি জানান, স্থানীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে এমন উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়।
ববি হাজ্জাজ বলেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে না। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করা হচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সরকারের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত শিক্ষকরা হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয় তুলে ধরেন। তারা জানান, বর্ষাকালে অনেক বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। এছাড়া কিছু এলাকায় শিক্ষক সংকট, শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান তারা।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বিদ্যালয় ফিডিং কর্মসূচি নিয়েও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকার যে বিদ্যালয় ফিডিং কর্মসূচি পরিচালনা করছে, সেখানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত পাঁচ ধরনের খাদ্যসামগ্রী বিতরণে যদি কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তা, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয় ফিডিং কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি, ঝরে পড়া কমানো এবং পুষ্টির ঘাটতি দূর করা। তাই এই কর্মসূচির সুফল যাতে প্রকৃত শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে, সে বিষয়ে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই কর্মসূচিকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করার সুযোগ পাবে না।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকার ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে দুর্গম ও পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর প্রতি সরকারের আলাদা নজর রয়েছে। তিনি বলেন, হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মতো সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকার রাখে এবং সেই লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, হাওরাঞ্চলের মতো ভৌগোলিকভাবে বিশেষ অঞ্চলে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করে পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘদিন পানিবন্দি অবস্থার কারণে অনেক সময় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাই বিকল্প শিক্ষাপদ্ধতি, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
স্থানীয় অভিভাবকদেরও প্রত্যাশা, সরকার ঘোষিত উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আরও উন্নত পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ পাবে। তাদের মতে, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত তদারকি এবং শিক্ষা উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
সুনামগঞ্জসহ দেশের হাওরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা, যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বর্ষা মৌসুমে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং নিয়মিত পাঠদান বাধাগ্রস্ত হয়। এ কারণে এই অঞ্চলের জন্য আলাদা পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি দীর্ঘদিনের। সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ সেই প্রত্যাশা পূরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, হাওরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয় ফিডিং কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে হাওরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরাও আরও মানসম্মত শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে।


