প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের ভোর এখন যেন নির্মাণশ্রমিকদের জন্য এক অদৃশ্য আতঙ্কের নাম। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ঘর ছাড়েন শত শত মানুষ, কিন্তু দিন শেষে সবাই ঘরে ফেরেন না। কেউ কেউ ফিরে আসেন লাশ হয়ে, কেউ হাসপাতালে আহত অবস্থায়, আর কেউ থেকে যান আজীবনের শারীরিক ও মানসিক ক্ষত নিয়ে। দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজার এলাকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আট নির্মাণশ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে সেই নির্মম বাস্তবতা—খরচ বাঁচাতে শ্রমিকদের পণ্যবাহী যানবাহনে গাদাগাদি করে বহনের পুরোনো ও বিপজ্জনক সংস্কৃতি।
রবিবার ভোর ৬টার দিকে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজার এলাকায় শ্রমিক বহনকারী একটি ডিআই ট্রাককে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় কাঁঠালবাহী একটি ট্রাক। ঘটনাস্থলেই চারজন নির্মাণশ্রমিক নিহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও চারজনের মৃত্যু হয়। আহত হন অন্তত সাতজন। স্থানীয় সূত্র ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ দুর্ঘটনার পর অনেকে ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন।
নিহত ও আহত শ্রমিকরা সবাই সিলেট নগরের আম্বরখানা এলাকা থেকে ভোরে ডিআই ট্রাকে করে ওসমানীনগরের গোয়ালাবাজারে যাচ্ছিলেন। সেখানে একটি বাড়ির ছাদের ঢালাই কাজে অংশ নেওয়ার কথা ছিল তাদের। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তারা জীবিকার আশায় কাজের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে মৃত্যুর মিছিল।
এই দুর্ঘটনা নতুন নয়, বরং বহু পুরোনো এক অব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি। ঠিক তিন বছর আগেও একই ধরনের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৪ নির্মাণশ্রমিক। ২০২৩ সালের ৭ জুন দক্ষিণ সুরমার নাজিরবাজার এলাকায় শ্রমিক বহনকারী ডিআই ট্রাকের সঙ্গে আরেকটি ট্রাকের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই নয়জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়। সেই শ্রমিকরাও আম্বরখানা থেকে গোয়ালাবাজারে যাচ্ছিলেন ঢালাই কাজে অংশ নিতে। দুই দুর্ঘটনার মধ্যে ভয়ঙ্কর মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের সঙ্গে একই ট্রাকে তোলা হয়েছিল ভারী নির্মাণযন্ত্র মিক্সার মেশিন। আর মেশিনের পাশে অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে বসানো হয়েছিল ২০ জনের বেশি শ্রমিককে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, একটি ডিআই ট্রাকে মিক্সার মেশিন তোলার পর সাধারণত সাত থেকে আটজনের বেশি নিরাপদে বসার সুযোগ থাকে না। কিন্তু বাস্তবে সেখানে ২০ থেকে ৩০ জন পর্যন্ত শ্রমিককে তোলা হয়। অতিরিক্ত ওজন ও ভারসাম্যহীনতার কারণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
সিলেট নগরের লোহারপাড়া এলাকার একটি কলোনিতে বসবাসকারী নির্মাণশ্রমিক হামিদ মিয়া দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, প্রতিদিন ভোরে শ্রমিকরা আম্বরখানায় জড়ো হন। সেখান থেকে ঠিকাদাররা বিভিন্ন নির্মাণসাইটে তাদের নিয়ে যান। দূরবর্তী এলাকায় কাজ হলে পিকআপ বা ডিআই ট্রাকই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই যাত্রা কতটা অমানবিক, তা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, মিক্সার মেশিন তোলার পর যে সামান্য জায়গা থাকে, সেখানে ২০-৩০ জন মানুষকে গাদাগাদি করে বসানো হয়। ঠিকমতো শ্বাস নেওয়ারও সুযোগ থাকে না। চালকরা ভোরের ফাঁকা সড়কে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান। প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুভয় নিয়েই যাত্রা করতে হয়।
কেন এমন ঝুঁকি নিয়েও শ্রমিকরা যান—এ প্রশ্নের উত্তরে হামিদ মিয়ার কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, না গেলে কাজ দেওয়া হয় না। পরিবার চালাতে হয়, তাই নিরুপায় হয়েই উঠতে হয় গাড়িতে। তার অভিযোগ, মূলত খরচ বাঁচানোর জন্যই ঠিকাদাররা এভাবে শ্রমিক পরিবহন করেন।
বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন ঢালাই ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও বেশিরভাগই মুখ খুলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঠিকাদার বলেন, এভাবে শ্রমিক নেওয়া বহুদিনের প্রচলন। মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে, কিন্তু প্রতিদিন তো ঘটে না। এই মন্তব্যই যেন শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতার সবচেয়ে নির্মম প্রতিচ্ছবি।
নির্মাণখাতের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকা সমাজকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্ট মঞ্জুর মোহাম্মদ বলেন, ভোরবেলা আম্বরখানা বা অনুরূপ শ্রমিক জড়ো হওয়ার স্থানগুলোতে গেলেই দেখা যায় কীভাবে শ্রমিকদের মিক্সার মেশিনের পাশে ঠাসাঠাসি করে ডিআই ট্রাকে তোলা হয়। তিনি জানান, ভারী যন্ত্রপাতির সঙ্গে শ্রমিক পরিবহনে বিধিনিষেধ থাকলেও বাস্তবে কেউ তা মানেন না। ক্ষেত্রবিশেষে ২৫ জনেরও বেশি শ্রমিককে একটি ছোট যানবাহনে তোলা হয়। এতে গাড়ির ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং সামান্য ভুলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে ভোরে। কারণ তখন চালকদের অনেকের চোখে ঘুম থাকে। আবার বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রাক বা পণ্যবাহী যানবাহনের চালকেরাও সারারাত গাড়ি চালিয়ে ক্লান্ত থাকেন। ফলে এক মুহূর্তের অসতর্কতাই কেড়ে নেয় বহু প্রাণ।
দীর্ঘদিন ট্রাকচালক ও মেকানিক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে আবদুর রহমানের। বর্তমানে তিনি চালকদের প্রশিক্ষণ দেন। তার ভাষ্য, অতিরিক্ত বোঝাই হলে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তিন টনের গাড়িতে যদি ১০ টন বোঝাই করা হয়, তাহলে জরুরি মুহূর্তে ব্রেক কষলেও স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। অথচ চালকদের অনেকেই অতিরিক্ত সতর্ক না হয়ে উল্টো দ্রুতগতিতে গাড়ি চালান। এ প্রবণতা বন্ধ না হলে দুর্ঘটনা কমবে না বলেও তিনি মনে করেন।
দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুল হাসান তালুকদার জানান, দুর্ঘটনার পর কাঁঠালবাহী ট্রাকের হেলপারকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, তাদের গাড়িটি অতিরিক্ত বোঝাই ছিল। একটি মোড়ে গাড়ি নামানোর সময় বিপরীত দিক থেকে আসা ডিআই ট্রাক দ্রুতগতিতে আসছিল। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে।
তিনি বলেন, পণ্যবাহী যানবাহনে মানুষ পরিবহন আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু শ্রমিকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও সুযোগ পেলেই এসব গাড়িতে উঠে পড়েন। দুর্ঘটনা ঘটলে কিছুদিন আলোচনা হয়, এরপর সবাই ভুলে যায়। ফলে একই চিত্র বারবার ফিরে আসে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্মাণশ্রমিকদের জন্য নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের দুর্ঘটনা বন্ধ হবে না। শ্রমিকদের জীবনের মূল্য অনেক ক্ষেত্রেই ঠিকাদারদের কাছে কয়েক হাজার টাকা পরিবহন খরচের চেয়েও কম। অথচ এসব শ্রমিকই শহর গড়ে তোলেন, বহুতল ভবনের ছাদ নির্মাণ করেন, উন্নয়নের চাকা সচল রাখেন। কিন্তু তাদের যাতায়াতের ন্যূনতম নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হয় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুর্ঘটনার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই শ্রমিকদের জন্য আলাদা পরিবহনব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, শুধু চালকের দোষ দিয়ে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই; এর পেছনে রয়েছে পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতা, যেখানে শ্রমিকের জীবনকে সবচেয়ে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বারবার প্রাণহানির পরও যদি পরিস্থিতির পরিবর্তন না আসে, তবে সিলেটের ভোরে এমন মৃত্যুমিছিল হয়তো আরও দীর্ঘ হবে। আর প্রতিদিনের মতো আগামীকালও জীবিকার সন্ধানে শত শত শ্রমিক আবারও উঠে পড়বেন ঝুঁকিপূর্ণ কোনো ডিআই ট্রাক বা পিকআপ ভ্যানে—কারণ বেঁচে থাকার জন্য তাদের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা নেই।


