প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগজুড়ে আবারও বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল এবং নিম্নাঞ্চলে ইতোমধ্যে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁইছুঁই করছে, আবার কিছু এলাকায় তা অতিক্রমও করেছে। এতে জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক সবচেয়ে বেশি, কারণ এখনো অনেক জায়গায় বোরো ধান পুরোপুরি ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি।
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালার প্রভাবে কয়েকদিন ধরে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হচ্ছে। এর সঙ্গে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল যোগ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েকদিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি থেকে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে মৌলভীবাজারে। জেলায় ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া শেরপুরে ১৮০ মিলিমিটার এবং শ্রীমঙ্গলে ১৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, তাহিরপুর, বড়লেখা ও সিলেটের বিভিন্ন এলাকাতেও ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট মহানগর ও আশপাশ এলাকায় ১২৭ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সারাদিন আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন এবং মাঝেমধ্যে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি অব্যাহত ছিল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মৌলভীবাজার জেলায়। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জুড়ী নদীর পানি বিপদসীমার ৮৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মনু ও ধলাই নদীর পানিও বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।
জেলার হাকালুকি হাওর তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে বন্যার পানি ঢুকতে শুরু করেছে। নিম্নাঞ্চলের বহু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে কৃষকরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। কারণ অনেক স্থানে পাকা বোরো ধান এখনো মাঠে রয়েছে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় রয়েছে প্রায় ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমি। যদিও হাওরাঞ্চলের প্রায় ৭৭ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে, তবুও বাকি ফসল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
জেলার বিভিন্ন হাওর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও ধানের ক্ষেত পানির নিচে চলে গেছে, কোথাও আবার কৃষকরা দিন-রাত এক করে ধান কাটার চেষ্টা করছেন। অনেক কৃষক শ্রমিক সংকট ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সময়মতো ধান ঘরে তুলতে পারেননি।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, হঠাৎ করে এমন টানা বৃষ্টি ও ঢলে তারা বিপাকে পড়েছেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে ধান চাষ করেছেন। এখন ফসল নষ্ট হলে সেই ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে কয়েকদিন ধরেই কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছিল। তবে কিছু নিম্নাঞ্চলে ইতোমধ্যে বোরো ধান ডুবে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলায় এরনবিল বা ইকরাছই হাওরে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে। সীমান্তবর্তী মনাই নদীতে চাপ বেড়ে যাওয়ায় হামিদপুর গ্রামের পাশের একটি গ্রামীণ সড়ক ভেঙে হাওরে পানি প্রবেশ করছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, পানি আরও বাড়লে হাওরের বাকি ফসলও তলিয়ে যেতে পারে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাঙন ঠেকাতে চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জয় ঘোষ বলেন, এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নয়, একটি গ্রামীণ সড়ক। পাহাড়ি ঢলের কারণে সড়কটি ভেঙে গেছে। অধিকাংশ ফসল কাটা শেষ হলেও এখনও কিছু জমির ধান পানির নিচে রয়েছে।
হবিগঞ্জ ও সিলেটের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলেও জলাবদ্ধতা ও প্লাবনের খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে হাওর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে কৃষকরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতায় তারা জানেন, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিই বড় ধরনের বন্যা ডেকে আনতে পারে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী তিনদিন দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। এতে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে এবং নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের কোথাও কোথাও অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। একই সঙ্গে সিলেটসহ দেশের কয়েকটি অঞ্চলের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এজন্য নদীবন্দরগুলোকে ২ নম্বর নৌ হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের প্রবণতা বেড়েছে। এতে কৃষি, জনজীবন ও অবকাঠামো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সিলেট বিভাগের মানুষ এখন উদ্বেগ আর শঙ্কার মধ্যে দিন পার করছেন। আকাশে জমে থাকা কালো মেঘ আর টানা বৃষ্টির শব্দ যেন তাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে অতীতের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি। বিশেষ করে কৃষকদের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন—বাকি ধান কি ঘরে তুলতে পারবেন, নাকি সবকিছু পানির নিচে হারিয়ে যাবে?


