প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
টানা দুই দিনের ভারী বর্ষণ এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার নিম্নাঞ্চল ও হাওর তীরবর্তী বহু এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অন্তত পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। একদিকে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে অব্যাহত বৃষ্টিপাতে মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে কৃষক পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। কারণ অনেক এলাকায় বোরো ধান এখনো পুরোপুরি ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি।
মঙ্গলবার সকাল থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অনেক রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বাড়ির উঠান পেরিয়ে ঘরের ভেতরেও পানি ঢুকেছে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ। স্থানীয়দের আশঙ্কা, আগামী কয়েকদিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
জেলার রাজনগর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, বড়লেখা ও সদর উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজনগর উপজেলার পূর্ব নন্দীউড়া ও ভুজবল গ্রামে উদনা নদী-সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। এতে বসতবাড়ি, গ্রামীণ সড়ক ও কৃষিজমি তলিয়ে গেছে। কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজার, আদমপুর ও পতনঊষার ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায়ও একই চিত্র দেখা গেছে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা উঁচু স্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েকদিন ধরে একটানা বৃষ্টি হচ্ছে। এর সঙ্গে ভারতের উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নামায় পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। মঙ্গলবার সকালে অনেক এলাকার রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ পানির নিচে চলে যায়। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে।
কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজার ইউনিয়নের বাসিন্দা কাওছার আহমেদ বলেন, “দুই দিন ধরে টানা বৃষ্টি। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি রাস্তাঘাট সব পানির নিচে। ঘরের ভেতরেও পানি ঢুকেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ছোট শিশু ও বয়স্ক মানুষ নিয়ে খুব কষ্টে আছি।”
একই এলাকার নজরুল আহমেদ বলেন, “আমাদের বোরো ধান প্রায় তলিয়ে গেছে। এখনো কাটতে পারিনি। এত কষ্ট করে চাষ করলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়তো কিছুই ঘরে তুলতে পারব না।”
জেলার নদ-নদীগুলোর পানিও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মনু, ধলাই, কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে জুড়ী নদীর পানি একপর্যায়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করলেও পরে কিছুটা কমে এসেছে। তবে পানি এখনো উচ্চ অবস্থানে রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেলার মনু ও ধলাই নদীর ছয়টি প্রতিরক্ষা বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। উজানে আরও ভারী বর্ষণ হলে বাঁধগুলোতে চাপ বাড়তে পারে। ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, “আমরা জেলার প্রধান নদীগুলোর পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছি। বর্তমানে অধিকাংশ নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। উজানে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।”
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালার কারণে এই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত জেলায় ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী কয়েকদিনও বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।
এদিকে বন্যার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকদের দুশ্চিন্তাও বাড়ছে। জেলার বিভিন্ন হাওর ও নিম্নাঞ্চলে এখনো কিছু বোরো ধান মাঠে রয়েছে। কৃষকরা বলছেন, পানি আরও বাড়লে এসব ধান নষ্ট হয়ে যাবে। এতে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে মৌলভীবাজার জেলায় ব্যাপক পরিসরে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। যদিও অধিকাংশ হাওর এলাকায় ধান কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে, তবুও নিচু এলাকার অনেক কৃষক এখনো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি।
জেলা প্রশাসন ও ত্রাণ বিভাগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা প্রস্তুত করার কাজ শুরু হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় অনেক এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগে সমস্যা হচ্ছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া বলেন, “আমরা সব উপজেলায় নির্দেশনা দিয়েছি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তালিকা তৈরির জন্য। জরুরি খাদ্য সহায়তা ও নগদ অর্থ বরাদ্দের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই একই ধরনের দুর্ভোগে পড়তে হয়। নদী খনন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে হাওর ও নিম্নাঞ্চলের মানুষ বছরের পর বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন।
মৌলভীবাজারের মানুষ এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। বৃষ্টি থামবে কি না, পানি কমবে নাকি আরও বাড়বে—এই অনিশ্চয়তা নিয়েই তাদের প্রতিটি মুহূর্ত পার হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষক পরিবারগুলোর চোখেমুখে স্পষ্ট উদ্বেগ। কারণ ফসল হারালে শুধু একটি মৌসুম নয়, পুরো বছরের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে যাবে।


