প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন খাতে পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে পরিবহন খাতে এর সরাসরি প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। তবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেটে এখনো কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছেন আন্তঃজেলা বা লোকাল বাসযাত্রীরা। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানীয় রুটে এখনো বাসভাড়া বাড়ানো হয়নি। জাফলং, জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, বড়লেখা ও সিতারকান্দিসহ একাধিক রুটে আগের ভাড়াতেই যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। অন্যদিকে দূরপাল্লার পরিবহনগুলো ইতোমধ্যে নতুন ভাড়া কার্যকর করেছে, ফলে সাধারণ যাত্রীদের ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
সিলেট নগরীর কদমতলী ও সোবহানীঘাট বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় রুটের যাত্রীদের মধ্যে এখনো স্বস্তি কাজ করছে। জাফলংগামী যাত্রীরা আগের মতোই ১১০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে যাতায়াত করতে পারছেন। একইভাবে বিয়ানীবাজার, বড়লেখা ও জকিগঞ্জ রুটেও পূর্বের নির্ধারিত ভাড়া বহাল রয়েছে। তবে পরিবহন শ্রমিক ও মালিকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ভাড়া ধরে রাখা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নাও হতে পারে।
জাফলং রুটে চলাচলকারী একটি বাসের কর্মী আল-আমিন জানান, কয়েকদিন আগেও ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ছিল ১০০ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে ১১৫ টাকায় পৌঁছেছে। এতে প্রতিদিন পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু যাত্রীদের কথা বিবেচনা করে এখনো ভাড়া বাড়ানো হয়নি। তিনি বলেন, “লোকাল রুটের বেশিরভাগ যাত্রী নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির। হঠাৎ ভাড়া বাড়ালে তাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে।”
সিলেট-জকিগঞ্জ বাস মালিক সমিতির সহ-সভাপতি আব্দুল আজিজ আজিম বলেন, এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে তেলের বাড়তি খরচ পরিবহন খাতের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। তিনি জানান, সিলেট থেকে জকিগঞ্জ রুটে প্রতিটি বাসে আগের তুলনায় প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেশি জ্বালানি ব্যয় হচ্ছে। একই অবস্থা বিয়ানীবাজার ও বড়লেখা রুটেও দেখা যাচ্ছে। এতে চালক ও শ্রমিকদের আয় কমে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রাপ্য পারিশ্রমিক থেকেও তেলের খরচ মেটাতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই না যাত্রীদের ওপর বাড়তি চাপ দিতে। কিন্তু যদি তেলের দাম আরও বাড়ে বা দীর্ঘসময় এ অবস্থা থাকে, তাহলে লোকাল ভাড়াও সমন্বয় করতে হতে পারে।”
স্থানীয় বাসচালক কামাল আহমেদ বলেন, আগে যেখানে একটি ট্রিপ শেষে কিছুটা সঞ্চয় থাকত, এখন প্রায় পুরো টাকাই জ্বালানি খরচে চলে যাচ্ছে। তারপরও মালিকপক্ষ ও শ্রমিকরা আপাতত যাত্রীদের কথা ভেবে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। বর্তমানে সিলেট থেকে জকিগঞ্জ রুটে ভাড়া ১৯০ টাকা, বড়লেখা ১৫০ টাকা এবং বিয়ানীবাজার ১১০ টাকা রয়েছে।
অন্যদিকে দূরপাল্লার পরিবহনগুলোতে ইতোমধ্যে নতুন ভাড়া কার্যকর হয়েছে। সিলেট থেকে ঢাকা, নরসিংদী, ভৈরবসহ বিভিন্ন রুটে বাসভাড়া বাড়ানো হয়েছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘপথে জ্বালানি খরচ বেশি হওয়ায় তারা বাধ্য হয়েই ভাড়া সমন্বয় করেছেন।
এনা পরিবহনের সিলেট কাউন্টারের ক্যাশিয়ার সোহেল আহমদ জানান, সরকারিভাবে ঢাকার ভাড়া ৭১০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও তারা যাত্রীদের কাছ থেকে ৭০০ টাকা নিচ্ছেন। নরসিংদীর ভাড়া ৫৫০ টাকার পরিবর্তে ৫২০ টাকা রাখা হয়েছে। এমনকি এসি বাসে আগের ১৫০০ টাকাই নেওয়া হচ্ছে, যদিও সরকার নির্ধারিত ভাড়া ১৭০০ টাকা। তিনি বলেন, “যাত্রীদের কথা বিবেচনা করেই আমরা কিছুটা ছাড় দিচ্ছি। কিন্তু ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে নতুন ভাড়া কার্যকর না করলে পরিবহন চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।”
তিনি জানান, গত ২৫ এপ্রিল বিকেল থেকে নতুন ভাড়া কার্যকর করা হয়েছে। ম্যানেজমেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে নতুন ভাড়ায় টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে।
কদমতলীর হানিফ পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, বিআরটিএর নির্দেশনা অনুযায়ী তেলের দাম বাড়ার পাঁচ থেকে ছয় দিনের মধ্যেই নতুন ভাড়া কার্যকর করা হয়। বর্তমানে ঢাকা রুটে ভাড়া ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ৭৪০ টাকা হয়েছে। ভৈরব ও নরসিংদী রুটেও ৩০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
তবে ভাড়া বৃদ্ধির ফলে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহন কর্তৃপক্ষের মাঝে প্রায়ই বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। অনেক যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়া দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। এতে কাউন্টার ও বাসস্ট্যান্ডে বাকবিতণ্ডার ঘটনাও বাড়ছে।
আল মোবারাকা পরিবহনের কদমতলী কাউন্টারের ম্যানেজার রেজাউল বলেন, “যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতে চান না। আবার যাত্রীসংখ্যাও কমে গেছে। ফলে মালিকপক্ষও বিপাকে পড়েছে।” তিনি জানান, আগে ঢাকার ভাড়া ছিল ৫০০ টাকা, বর্তমানে তা ৫৬০ টাকা হয়েছে। অনেক সময় যাত্রীদের কাছ থেকে ১০ টাকা কমও নেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও পরিবহন ব্যয় উঠছে না।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যাত্রী সংকটের কারণে অনেক বাস অর্ধেক আসন খালি রেখেই ছাড়তে হচ্ছে। একটি বাস পরিচালনায় যেখানে প্রায় ১৪ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়, সেখানে যাত্রীভাড়া থেকে উঠছে মাত্র ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। এতে পরিবহন ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন।
এদিকে সাধারণ যাত্রীরা পরিস্থিতিকে মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় দেখছেন। কেউ মনে করছেন জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভাড়া বাড়া স্বাভাবিক, আবার কেউ বলছেন একের পর এক মূল্যবৃদ্ধির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে।
ঢাকাগামী যাত্রী নাঈম বলেন, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছুটা ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরিবহন ভাড়াও আগের অবস্থায় ফিরে আসবে বলে তিনি আশা করেন।
অন্যদিকে কাঁচপুরগামী যাত্রী রোজিনা বলেন, “নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের খরচ বাড়ছে, এখন আবার বাসভাড়াও বাড়ল। সাধারণ মানুষের জীবন চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।” তিনি দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেন।
পরিবহন খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি গণপরিবহনের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে স্থানীয় রুটে এখনো ভাড়া না বাড়ানো সিলেটের জন্য কিছুটা ব্যতিক্রমী ঘটনা। এতে যাত্রীরা সাময়িক স্বস্তি পেলেও পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের আর্থিক চাপ বাড়ছে। যদি জ্বালানির মূল্য দীর্ঘসময় উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত লোকাল বাসভাড়াও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে সিলেটের পরিবহন খাতে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। একদিকে যাত্রীদের ভোগান্তি কম রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলানোর সংগ্রাম। তবে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি ও সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।


