প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরীতে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তার সম্পদ ও পারিবারিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ এখন চরম সংকটে রূপ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সৎপুত্রদের নির্যাতন, একের পর এক মামলা, সামাজিক অপমান এবং নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে ন্যায়বিচার ও নিরাপদ জীবনের দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধার তৃতীয় স্ত্রী সমছুন্নেহার সমছুন। তিনি দাবি করেছেন, স্বামীর বৈধ স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাকে এবং তার সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে সম্পদ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। একইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
বুধবার সিলেট জেলা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন নগরীর সুবিদবাজার এলাকার বনকলাপাড়াস্থ ৭৮ নূরানী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সমছুন্নেহার সমছুন। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সরকারি চাকরিজীবী মরহুম সৈয়দ তছির আহমদের তৃতীয় স্ত্রী বলে জানান। সংবাদ সম্মেলনে তার পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তার সৎপুত্র আবু নাঈম আজাদ।
সংবাদ সম্মেলনে সমছুন্নেহার অভিযোগ করেন, স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই সম্পদ নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মরহুম তছির আহমদের অন্য দুই স্ত্রীর সন্তানরা তাকে এবং তার সন্তানদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের চাপ ও ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত পরিবারের কয়েকজন সদস্য তাদের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্নভাবে হয়রানি করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে তার নাম এবং তার মেয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকার পরও বাস্তবে তারা কোনো সম্পত্তির অংশ বুঝে পাননি। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা ভাতার ক্ষেত্রেও তাকে বঞ্চিত করার চেষ্টা হয়েছে। তার দাবি, ২০১৭ সালে সমাজসেবা অফিসে অসত্য তথ্য দিয়ে তার প্রাপ্য মুক্তিযোদ্ধা ভাতা স্থগিত করা হয়েছিল। পরে তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা প্রমাণিত হলে তিন স্ত্রীর মধ্যে সমানভাবে ভাতার অর্থ বণ্টনের সিদ্ধান্ত হয়।
সমছুন্নেহার আরও অভিযোগ করেন, শুধু সম্পত্তি নয়, পেনশনের অর্থ এবং বসতবাড়ির ন্যায্য অংশ থেকেও তাকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। তার মতে, পরিবারে যারা তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাদেরও নানা মামলায় জড়িয়ে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত বক্তব্যে বলা হয়, সমছুন্নেহারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তার সৎপুত্র আবু নাঈম আজাদও একাধিক মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ এনে মামলা করা হয়। যদিও তদন্ত শেষে আদালত একটি মামলা খারিজ করে দেন বলে দাবি করা হয়।
এছাড়া ২০২৩ সালে সমছুন্নেহার এবং তার মেয়ের বিরুদ্ধে সিলেটের একটি আদালতে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয় বলেও উল্লেখ করা হয়। ওই মামলাও তদন্ত শেষে খারিজ হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। তবে পরবর্তীতে আরেকটি মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তুলে সমছুন্নেহার অভিযোগ করেন, তদন্তে পূর্ববর্তী কাগজপত্র ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি।
তিনি দাবি করেন, অতীতে পিবিআইয়ের তদন্তে তাকে এবং তার মেয়েকে বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে মোট ১৫ জন উত্তরাধিকারীর তথ্য উঠে আসে। কিন্তু পরবর্তী একটি তদন্তে ভিন্ন ধরনের প্রতিবেদন দেওয়ায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও গুরুতর অভিযোগ আনা হয় তার মেয়ের ওপর হামলার বিষয়ে। সমছুন্নেহারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে আদালত থেকে জামিনে বের হওয়ার পর তার মেয়ে রুজিনা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। তিনি অভিযোগ করেন, ওই ঘটনায় তার অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়, যার ফলে গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। পরে এ ঘটনায় আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কোনো বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়নি। স্বাধীনভাবে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করাও সম্ভব হয়নি। গণমাধ্যমে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত তথ্যসমূহ বক্তাদের নিজস্ব বক্তব্য এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের মতামত নেওয়া হয়নি।
আইনজীবী ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিশেষ করে একাধিক স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে উত্তরাধিকার বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিলতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকে। এতে পারিবারিক সম্পর্ক যেমন নষ্ট হয়, তেমনি মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়েন সংশ্লিষ্টরা।
নারী অধিকারকর্মীদের মতে, স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক নারী বাস্তব জীবনে তাদের আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নারীরা প্রভাবশালী আত্মীয়স্বজনের চাপে ন্যায়বিচার পান না। ফলে আদালত, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সমছুন্নেহার সংবাদ সম্মেলনে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিচার বিভাগের প্রতি সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান। একইসঙ্গে তিনি পরিবারের সদস্যদের প্রতি মামলা-মোকদ্দমা ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বন্ধ করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
তার ভাষায়, “আমি জীবনের শেষ বয়সে শান্তিতে থাকতে চাই। স্বামীর বৈধ স্ত্রী হিসেবে আমার এবং আমার মেয়ের ন্যায্য অধিকার চাই। মামলা আর ভয়ভীতির মধ্যে আমরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি।”
সংবাদ সম্মেলনে তার মেয়ে রুজিনা এবং আত্মীয়স্বজন উপস্থিত ছিলেন। পুরো ঘটনাটি ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে বিষয়টি যেহেতু আদালত ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট, তাই অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা নির্ধারণে বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


