প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং সৌন্দর্যবর্ধনের লক্ষ্যে সুরমা নদীকে কেন্দ্র করে একটি বৃহৎ ও বহুমাত্রিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় নদীর দুই তীরে স্লুইস গেট, আধুনিক ওয়াকওয়ে এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে, যা নগরীর পরিবেশ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আগামী শনিবার সিলেট সফরে এসে এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর এই সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি এবং জলাবদ্ধতার সমস্যাকে সামনে রেখে এই প্রকল্পকে সিলেটের উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরীকে ‘গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই সুরমা নদীকে কেন্দ্র করে এই বৃহৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীতীরবর্তী এলাকা এই উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আসবে। এর মাধ্যমে নদীর দুই তীরকে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ও আধুনিকায়ন করা হবে।
প্রকল্পের প্রধান উপাদান হিসেবে থাকবে স্লুইস গেট নির্মাণ, যা নদীর পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে নগরীর জলাবদ্ধতা কমাতে এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নদীর দুই তীরে নির্মিত হবে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে, যেখানে নাগরিকরা হাঁটাচলা, বিনোদন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে পারবেন।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিলেট নগরী একটি আধুনিক নদীকেন্দ্রিক শহরে পরিণত হবে। তাঁর মতে, শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং এটি নগরীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সুরমা নদী অব্যবস্থাপনা ও নাব্যতা সংকটে ভুগছে, যা এই প্রকল্পের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সমাধান হবে।
তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর দুই তীরে শক্তিশালী বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে সবুজায়ন, বসার স্থান, আলোকসজ্জা এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। ফলে সুরমা নদী শুধু প্রাকৃতিক জলধারা হিসেবে নয়, বরং একটি আধুনিক নগর বিনোদনকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠবে।
আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী আরও উল্লেখ করেন, সিলেটকে উন্নয়নের মূলধারায় নিয়ে যেতে সরকারের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীতকরণ এবং রেলপথে ডাবল লাইন স্থাপনের মতো প্রকল্পগুলো উল্লেখযোগ্য। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ ও গতিশীল হবে।
তিনি বলেন, সুরমা নদী পুনরুজ্জীবিত করা এই প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খনন কার্যক্রমসহ প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কাজ ইতোমধ্যে পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বরাক নদ থেকে উৎপত্তিস্থল জকিগঞ্জের আমলসীদ হয়ে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের মারকুলি পর্যন্ত নদী খননের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর ফলে শুধু সুরমা নয়, কুশিয়ারা নদীরও নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুরমা নদীকে কেন্দ্র করে এই ধরনের সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প সিলেট নগরীর দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি নগরীর পরিবেশ উন্নয়ন, পর্যটন বিকাশ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
স্থানীয় বাসিন্দারাও এই প্রকল্প নিয়ে আশাবাদী। তাঁদের মতে, সুরমা নদী একসময় সিলেটের প্রাণ ছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি অবহেলার শিকার হয়েছে। এখন যদি পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা হয়, তাহলে নদী আবারও নগরীর সৌন্দর্য ও জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন, নদীকেন্দ্রিক উন্নয়ন আধুনিক শহর গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের অনেক শহরেই নদীকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে, যা সেসব শহরকে আরও বাসযোগ্য ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সিলেটও সেই পথে এগিয়ে যেতে পারে এই প্রকল্পের মাধ্যমে।
সব মিলিয়ে, সুরমা নদীকে ঘিরে নেওয়া এই উন্নয়ন প্রকল্প সিলেটের নগর পরিকল্পনায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ উন্নয়ন এবং নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি সিলেটকে একটি আধুনিক ও টেকসই নগরীতে পরিণত করার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

