প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনজীবনে আবারও অস্বস্তির বার্তা নিয়ে হাজির হচ্ছে বন্যার সম্ভাবনা। সিলেট বিভাগসহ দেশের পাঁচটি জেলায় আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। উজানে ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে টানা ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে সুরমা-কুশিয়ারাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাতে পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে দেওয়া সর্বশেষ পূর্বাভাসে এই শঙ্কার কথা জানানো হয়। সেখানে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা-কুশিয়ারা এবং ধনু-বাউলাই নদীসমূহের পানির সমতল উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও ভুগাই-কংস নদীর পানির স্তর বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে, তবুও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সামনে ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকা এমনিতেই প্রাকৃতিকভাবে বন্যাপ্রবণ এলাকা। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এখানে পানি বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক ঘটনা হলেও, প্রাক-মৌসুমি সময়ে আকস্মিক বন্যা দেখা দিলে তা কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। এ বছর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে, কারণ উজানের অতিবৃষ্টি এবং স্থানীয় বৃষ্টিপাত মিলিয়ে নদীগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে পাউবো জানিয়েছে, গত সাত দিনে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক থাকলেও আগামী সাত দিনে এই প্রবণতা বদলাতে পারে। ২৩ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে অঞ্চলটিতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৫০ থেকে ৩০০ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই অতিবৃষ্টির প্রভাব সরাসরি পড়বে হাওর অঞ্চলের নদ-নদীগুলোর ওপর। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সপ্তাহের প্রথম দিকে নদীগুলোর পানি কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও ২৮ এপ্রিলের পর থেকে তা দ্রুত বাড়তে পারে। এতে সুরমা-কুশিয়ারা, ধনু-বাউলাই এবং ভুগাই-কংস নদীগুলো কোথাও কোথাও প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং নেত্রকোণা জেলার নিম্নাঞ্চলগুলোতে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এসব এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর হওয়ায় এই শঙ্কা তাদের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বোরো ধান কাটার মৌসুমে বন্যা দেখা দিলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরেই নদীর পানি ধীরে ধীরে বাড়ছে। অনেক জায়গায় নদীর তীর উপচে পানি আশপাশের নিচু জমিতে ঢুকতে শুরু করেছে। যদিও এখনো বড় ধরনের প্লাবন দেখা যায়নি, তবুও আগাম সতর্কতা হিসেবে মানুষজন তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উজানের বৃষ্টিপাতের ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও আগাম প্রস্তুতি গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এজন্য স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে জনগণকে সচেতন করা এবং দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
পাউবোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রয়োজনে আরও সতর্কবার্তা দেওয়া হবে। নদীগুলোর পানি প্রবাহ, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়মিতভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
এদিকে পরিবেশবিদরা দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধারা বদলে যাচ্ছে, ফলে এ ধরনের আকস্মিক বন্যার ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু তাৎক্ষণিক মোকাবিলা নয়, টেকসই পরিকল্পনার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
হাওর অঞ্চলের মানুষের জন্য বন্যা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও প্রতিবারই নতুন করে আশঙ্কা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটাতে হয় তাদের। এবারের সম্ভাব্য বন্যাও সেই শঙ্কাকে আরও গভীর করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে সতর্ক থাকা এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা। নদীর পানি বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণই হতে পারে এই দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।


