প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে সীমান্তঘেঁষা যাদুকাটা নদীতে গোসল করতে নেমে আবু সুফিয়ান নামের এক কিশোর মাদ্রাসাছাত্র নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও উদ্বেগের ছায়া নেমে এসেছে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বিকেলে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় পরিবার, সহপাঠী ও স্থানীয়দের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। এখনো পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান না মেলায় সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তা।
নিখোঁজ আবু সুফিয়ান (১৪) উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের দশগড় গ্রামের বাসিন্দা রবি মিয়ার ছেলে। সে স্থানীয় শাহ আরেফিন দাখিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের আদরের সন্তান সুফিয়ানের এমন আকস্মিক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে মাদ্রাসার ৪ থেকে ৫ জন সহপাঠীর সঙ্গে যাদুকাটা নদীতে গোসল করতে যায় সুফিয়ান। গরমের মধ্যে নদীতে গোসল করতে নামা ছিল তাদের জন্য স্বাভাবিক একটি বিষয়। তবে আনন্দঘন সেই মুহূর্ত হঠাৎ করেই রূপ নেয় শোকাবহ ঘটনায়। সাঁতার কাটতে কাটতে তারা সীমান্ত পিলার ১২০৩ অতিক্রম করে অজান্তেই ভারতের অভ্যন্তরে প্রায় ১২০০ গজ ভেতরে ঢুকে পড়ে।
সহপাঠীদের বর্ণনা অনুযায়ী, নদীর ওই অংশে প্রবল স্রোত ছিল। একপর্যায়ে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করার সময় হঠাৎ করে সুফিয়ান স্রোতের তোড়ে তলিয়ে যায় এবং চোখের পলকে নিখোঁজ হয়ে পড়ে। তার সঙ্গীরা প্রথমে তাকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়ে চিৎকার শুরু করে। তাদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন এবং দ্রুত নদীতে তল্লাশি শুরু করেন।
স্থানীয় জেলেরা এবং এলাকাবাসী দীর্ঘ সময় ধরে নদীতে খোঁজাখুঁজি চালালেও সুফিয়ানের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর মুহূর্তেই এলাকায় মানুষের ঢল নামে। কেউ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেছেন, কেউ আবার নিজেরাই উদ্ধার কাজে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও কোনো আশার খবর মেলেনি।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ। তবে দুর্ঘটনাস্থলটি আন্তর্জাতিক সীমান্তের ভেতরে হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতায় তাৎক্ষণিকভাবে জটিলতা তৈরি হয়। বাদাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (এসআই) নাজমুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যেহেতু ঘটনাটি ভারতের সীমানার ভেতরে ঘটেছে, তাই সরাসরি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
এদিকে সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিজিবি এবং ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের মধ্যে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়ে যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার চেষ্টা চলছে। তবে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
সুফিয়ানের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। তার মা বারবার সন্তানের নাম ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। স্বজনরা বলছেন, খুবই শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের ছেলে ছিল সুফিয়ান। পড়াশোনার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষায় মনোযোগী ছিল সে। এমন একটি দুর্ঘটনা তাদের কল্পনার বাইরে ছিল।
স্থানীয়দের মতে, যাদুকাটা নদী সৌন্দর্যের জন্য যেমন বিখ্যাত, তেমনি এর স্রোত অনেক সময় বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের আগে-পরে নদীর পানি ও স্রোতের ধরন হঠাৎ পরিবর্তিত হয়, যা অনেকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে তারা প্রশাসনের কাছে নদীর ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে গোসল বা সাঁতার কাটার সময় অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ এসব এলাকায় স্রোতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সীমারেখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অজান্তেই অন্য দেশের সীমানায় প্রবেশ করলে উদ্ধার কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে, যা এই ঘটনার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে বলে জানিয়েছে। তারা আশ্বাস দিয়েছেন, সম্ভাব্য সব উপায়ে নিখোঁজ কিশোরকে খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
সব মিলিয়ে যাদুকাটা নদীর এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো এলাকার জন্য গভীর শোক ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময় যতই পেরিয়ে যাচ্ছে, ততই বাড়ছে উৎকণ্ঠা। এখন সবার একটাই প্রত্যাশা—নিখোঁজ সুফিয়ানকে দ্রুত খুঁজে পাওয়া যাক এবং এই ধরনের দুর্ঘটনা যেন ভবিষ্যতে আর না ঘটে।


