প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে আলোচিত লুৎফর রহমান হত্যাচেষ্টা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত রাশেদ আহমদকে রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকা এই আসামিকে যৌথ অভিযানের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করার পর পুরো এলাকায় স্বস্তির পাশাপাশি নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
র্যাব-৯ এবং র্যাব-১০ এর সমন্বয়ে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে গত ২২ এপ্রিল রাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জ থানাধীন চণ্ডীপুর চৌরাস্তা এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) র্যাবের গণমাধ্যম শাখা আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করে। সংস্থাটি জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। অভিযানের সময় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন এবং পরিচয় গোপন করে চলাফেরা করছিলেন বলে জানা গেছে।
গ্রেপ্তারকৃত রাশেদ আহমদ (২৬) শ্রীমঙ্গল উপজেলার শাপলাবাগ এলাকার বাসিন্দা এবং রহিম মিয়ার ছেলে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এই হত্যাচেষ্টা মামলার পর থেকেই তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন।
মামলার বিবরণে জানা গেছে, ভুক্তভোগী লুৎফর রহমান শ্রীমঙ্গল উপজেলার দক্ষিণ উত্তরসুর এলাকার বাসিন্দা এবং স্থানীয় সিএনজি শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে তার সোচ্চার ভূমিকা তাকে একটি শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়, কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করে শত্রুতা। স্থানীয় মাদক চক্র ও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তার বিরোধ দীর্ঘদিনের বলে জানা গেছে।
ঘটনার দিন গত ১২ এপ্রিল সন্ধ্যা ৮টার দিকে লুৎফর রহমান বাড়ি থেকে সিন্দুরখান সড়কের দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে শাপলাবাগ রেলওয়ে ক্রসিং এলাকায় পৌঁছালে আগে থেকেই ওঁত পেতে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা তাকে মারাত্মকভাবে জখম করে এবং তার কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেয়। শুধু তাই নয়, ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার আগে তারা মামলা করলে প্রাণনাশের হুমকিও দেয়।
স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় গুরুতর আহত অবস্থায় লুৎফর রহমানকে প্রথমে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে, যদিও তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ এখনো কাটেনি।
এই ঘটনার পর ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে শ্রীমঙ্গল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি দায়ের হওয়ার পরপরই র্যাব-৯ ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে তৎপরতা বাড়ায়। তদন্তের এক পর্যায়ে তারা জানতে পারে যে, রাশেদ আহমদ ঢাকায় আত্মগোপনে রয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই কেরানীগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
র্যাবের মিডিয়া অফিসার কে এম শহিদুল সোহাগ জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, মামলার অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, লুৎফর রহমানের ওপর হামলার ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং এটি মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া একজন সমাজকর্মীর ওপর সংঘবদ্ধ আঘাত। এতে করে এলাকায় মাদকবিরোধী আন্দোলন কিছুটা শঙ্কার মুখে পড়েছে। তবে অনেকেই মনে করছেন, এই গ্রেপ্তার মাদকবিরোধী কার্যক্রমে নতুন করে সাহস যোগাবে।
শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা এই গ্রেপ্তারকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই দ্রুত পদক্ষেপ অপরাধীদের জন্য একটি বার্তা হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে তারা বাকি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদকসংক্রান্ত অপরাধ এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর অবস্থান জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যারা মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রাশেদ আহমদের গ্রেপ্তার এই মামলার তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে প্রকৃত স্বস্তি আসবে তখনই, যখন পুরো ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা যাবে। এদিকে সাধারণ মানুষও চায়, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হয়।


