প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় এক রাতের ব্যবধানে একাধিক চুরি এবং পরদিন সকালে প্রকাশ্য ছিনতাইয়ের ঘটনায় জনমনে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রবাসী অধ্যুষিত এই জনপদে সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ এবং শ্রমজীবী শ্রেণির মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি দিন দিন গভীর হচ্ছে।
ঘটনাগুলোর কেন্দ্রবিন্দু লামাকাজী ইউনিয়নের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা লামাকাজী বাজার। বুধবার (২২ এপ্রিল) দিবাগত রাতে বাজারের অন্তত দুটি দোকানে চুরির ঘটনা ঘটে এবং একটি স্বর্ণের দোকানে চুরির চেষ্টা চালানো হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সকালে একই বাজারের অদূরে এক অটোরিকশা চালক ছিনতাইয়ের শিকার হন। সব মিলিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সংঘটিত এসব ঘটনায় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাতের অন্ধকারে সংঘবদ্ধ চোরচক্র বাজারের দোকানগুলোকে টার্গেট করে। ‘শতরূপা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের টিনের চাল কেটে ভেতরে প্রবেশ করে চোরেরা। প্রতিষ্ঠানটির মালিক একেএম দুলাল জানান, দোকানের ভেতর থেকে প্রায় লক্ষাধিক টাকার মালামাল চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একই রাতে বাজারের আরেকটি বালু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে একটি বৈদ্যুতিক ফ্যান চুরি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একই রাতে বাজারে অবস্থিত ‘প্রতিভা জুয়েলার্স’ নামের একটি স্বর্ণের দোকানেও চুরির চেষ্টা চালানো হয়। দোকানটির মালিক অঙ্গ বণিক জানিয়েছেন, দোকানের টিনের চাল কেটে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত চোরেরা সফল হয়নি। তবে এমন দুঃসাহসিক চেষ্টায় তিনি এবং আশপাশের ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তাদের ভাষ্য, স্বর্ণের দোকানে চুরির চেষ্টা মানে অপরাধীরা আরও বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, যা ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।
রাতের এসব ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সকালে ঘটে যায় ছিনতাইয়ের ঘটনা। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে লামাকাজী বাজারের বনফুলের সামনে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক রুকন উদ্দিন ছিনতাইয়ের শিকার হন। তিনি উপজেলার খাজাঞ্চী ইউনিয়নের রাজাগঞ্জ বাজার এলাকার পুশনি গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা।
ভুক্তভোগী রুকন উদ্দিন জানান, তিনি একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীকে নিয়ে সৎপুর আলীম মাদ্রাসা কেন্দ্রে যাচ্ছিলেন। পথে পরীক্ষার্থীর কলম না থাকায় তা কিনতে বাজারে থামেন। ঠিক সেই সময় স্থানীয় মির্জারগাঁও গ্রামের আবুল লেইছ এবং তার সঙ্গে থাকা আরও কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তি তার ওপর হামলা চালায়। তারা তার কাছে থাকা নগদ ৩ হাজার ২৫০ টাকা এবং প্রায় ২০ হাজার টাকা মূল্যের একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এই ঘটনার পর রুকন উদ্দিন বিশ্বনাথ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে তিনি একজনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ৩-৪ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে রাতের চুরির ঘটনায় ব্যবসায়ী একেএম দুলালও পৃথক একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।
বিশ্বনাথ থানার অফিসার ইন-চার্জ গাজী মাহবুবুর রহমান অভিযোগগুলো পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ঘটনাগুলো গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু তদন্ত নয়, অপরাধ দমনে দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে এলাকায় চুরি, ছিনতাই এবং মাদকের উপদ্রব উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় বাজার ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় অপরাধীরা সুযোগ নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, নিয়মিত টহল এবং সিসিটিভি নজরদারি জোরদার না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে এমন ঘটনা খুব একটা দেখা যেত না। কিন্তু এখন প্রায়ই চুরি-ছিনতাইয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং রাতে দোকান রেখে যাওয়ার সময় ভীতি কাজ করছে।
অন্যদিকে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে মাদক একটি বড় কারণ। যুবসমাজের একটি অংশ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় তারা সহজ অর্থের জন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নয়, সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগও জরুরি বলে তারা মনে করছেন।
বিশ্বনাথ উপজেলায় প্রবাসীদের বসবাস বেশি হওয়ায় এখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তুলনামূলকভাবে সক্রিয়। ফলে অপরাধীদের কাছে এই এলাকা একটি টার্গেটে পরিণত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন, নচেৎ অপরাধের ঝুঁকি বাড়ে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শুধু ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নয়, পুরো এলাকার মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এখন চাইছেন দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।
সবশেষে বলা যায়, বিশ্বনাথের লামাকাজী বাজারে ঘটে যাওয়া এই ধারাবাহিক চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা স্থানীয়দের মনে যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে, তা সহজে কাটার নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় এই ধরনের অপরাধ আরও বিস্তার লাভ করতে পারে, যা একটি শান্তিপূর্ণ জনপদের জন্য মোটেও কাম্য নয়।


