প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের গণপরিবহন খাতে পড়তে শুরু করেছে আগেই। সেই ধারাবাহিকতায় সরকার কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও দেশের সব অঞ্চলে তা একযোগে কার্যকর হয়নি। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রুটে পুরোনো ভাড়াতেই যাত্রী পরিবহন চলছে, যা একদিকে যাত্রীদের সাময়িক স্বস্তি দিলেও অন্যদিকে তৈরি করেছে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নির্ধারিত নতুন ভাড়ার তালিকা হাতে পেলেই সিলেট অঞ্চলেও এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে। তাদের ধারণা, আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই নতুন ভাড়া বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে। তবে এর মধ্যেই যাত্রী ও পরিবহন মালিকদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে, কারণ ভাড়া বৃদ্ধির হার নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
সরেজমিনে সিলেটের বিভিন্ন রুট ঘুরে দেখা গেছে, সিলেট-হবিগঞ্জ, সিলেট-মৌলভীবাজার এবং সিলেট-ঢাকা সড়কে এখনো পুরোনো ভাড়াই বহাল রয়েছে। বাস কাউন্টার ও পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নতুন তালিকা পাননি। ফলে আগের নির্ধারিত ভাড়াতেই যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে।
যাত্রীদের জন্য এই পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তির হলেও এর মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তাও কাজ করছে। অনেক যাত্রী জানিয়েছেন, দেশের একেক অঞ্চলে একেক ধরনের ভাড়া কার্যকর হওয়ায় তারা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ছেন। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, হঠাৎ করে ভাড়া বাড়লে তাদের দৈনন্দিন খরচে চাপ পড়বে।
একজন নিয়মিত যাত্রী জানান, তিনি প্রতিদিন সিলেট থেকে মৌলভীবাজার যাতায়াত করেন। এখনো ভাড়া না বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি পেলেও তিনি মনে করেন, যেকোনো সময় ভাড়া বৃদ্ধি কার্যকর হতে পারে, তাই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে আরেক যাত্রী বলেন, সারা দেশে একযোগে ভাড়া কার্যকর না হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে এবং এটি দ্রুত সমাধান করা উচিত।
পরিবহন মালিকপক্ষের বক্তব্যও ভিন্ন দিক তুলে ধরছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবেদ সুলতানা তারেক জানিয়েছেন, এখনো পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও তদারকির অভাবে সিলেট অঞ্চলে নতুন ভাড়া কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। তবে বিআরটিএ থেকে আনুষ্ঠানিক তালিকা পাওয়ার পর দ্রুতই তা বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তবে ভাড়া বৃদ্ধির হার নিয়ে মালিকপক্ষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম যেভাবে বেড়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া বাড়ানো হয়নি। তারা কিলোমিটারপ্রতি ২৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১১ পয়সা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হওয়ায় অনেক পরিবহন মালিক আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন খাতে প্রভাব ফেলে, কারণ এটি পরিচালন ব্যয়ের একটি বড় অংশ। ফলে ভাড়া সমন্বয় না হলে মালিকরা ক্ষতির সম্মুখীন হন, আর অতিরিক্ত ভাড়া বাড়ালে যাত্রীদের ওপর চাপ পড়ে। এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে পরিবহন খাতের শ্রমিকদের মধ্যেও কিছুটা অনিশ্চয়তা কাজ করছে। তারা বলছেন, ভাড়া বৃদ্ধি কার্যকর হলে তাদের আয় বাড়তে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে যাত্রী কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। কারণ অতিরিক্ত ভাড়া অনেক যাত্রীকে বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাস পরিবহনের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই রুটগুলোতে যাতায়াত করেন। তাই ভাড়া সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দ্রুত এবং সমন্বিতভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা। যাত্রীদের স্বার্থ, মালিকদের দাবি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে একটি সুষম ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সিলেটে নতুন বাসভাড়া কার্যকরের বিষয়টি এখন সময়ের অপেক্ষা। এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হতে পারে। তবে এর আগে প্রয়োজন পরিষ্কার নির্দেশনা এবং কার্যকর তদারকি, যাতে যাত্রী ও পরিবহন খাত উভয়ই একটি স্থিতিশীল অবস্থায় থাকতে পারে।


