প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তজুড়ে গরু চোরাচালান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিনই সীমান্তের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় গরু অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি নিয়মিত অভিযান চালালেও চোরাকারবারিদের কৌশল ও সংগঠিত নেটওয়ার্কের কারণে এই প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। এতে সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুলাউড়া উপজেলার দত্তগ্রাম, লালারচক, কর্মধা, পৃথিমপাশা ও শরীফপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে ঈদুল আযহার আগে গরুর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই সময়টিতে চোরাকারবারিরা আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি টিলা, নদীপথ এবং নির্জন চরাঞ্চল ব্যবহার করে রাতের আঁধারে কিংবা ভোরের দিকে এসব গরু দেশে আনা হয়।
বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে পৃথক অভিযানে কুলাউড়ার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে অন্তত ১৯টি ভারতীয় গরু আটক করা হয়েছে। আটককৃত গরুগুলো পরে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করেছেন, এসব অভিযান সত্ত্বেও প্রতিদিনই কিছু গরু চোরাইপথে দেশে প্রবেশ করছে, যা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চোরাকারবারিরা অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে এই কাজ পরিচালনা করছে। তারা কখনো সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া কেটে, আবার কখনো মই ব্যবহার করে গরু পার করে। কিছু ক্ষেত্রে নদীপথ ব্যবহার করে গরু পাচার করা হয়, যা নজরদারির বাইরে থেকে যায়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শরীফপুর ইউনিয়নের চারিয়ার ঘাট, হাসারকোনা, কালারায়ের চর, নিশ্চিন্তপুর, চানপুর, বাগজুর, দত্তগ্রাম ও লালারচকসহ বেশ কয়েকটি এলাকা বর্তমানে চোরাচালানের হটস্পট হিসেবে পরিচিত।
অভিযোগ রয়েছে, এই চোরাচালান সিন্ডিকেটে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কিছু জনপ্রতিনিধির সম্পৃক্ততা রয়েছে। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে স্থানীয়দের অনেকেই দাবি করছেন, প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের বড় আকারের চোরাচালান সম্ভব নয়। তাদের মতে, অনেক সময় বিজিবি গরু আটক করার পর বিভিন্ন প্রভাব খাটিয়ে সেগুলো ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
এই প্রসঙ্গে শরীফপুর ইউনিয়নের এক জনপ্রতিনিধি জয়নুল ইসলাম বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় অনেক সময় দেশি গরুকেও ভারতীয় গরু সন্দেহে আটক করা হয়। তখন স্থানীয় কৃষকেরা তাদের গরু ছাড়ানোর জন্য জনপ্রতিনিধিদের দ্বারস্থ হন। তিনি স্বীকার করেন, ভারতীয় গরু দেশে ঢোকার ঘটনা সত্য, তবে সব ক্ষেত্রে একইভাবে বিচার করা উচিত নয়।
এদিকে শ্রীমঙ্গল ৪৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধে তাদের তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, “মাদক ও গরু চোরাচালান ঠেকাতে সীমান্তের জিরো লাইনের পাশে একাধিক চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে এবং নিয়মিত টহল পরিচালনা করা হচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
অন্যদিকে কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মোল্যা জানান, ঈদকে সামনে রেখে পুলিশও তাদের নজরদারি বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, “চোরাকারবারিদের ধরতে সড়কপথে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে এবং নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, চোরাই পথে আসা গরুগুলো পরে বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করা হয়, যার ফলে বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। তারা মনে করছেন, এই অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং স্থানীয় খামারিদেরও ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা চোরাচালান একটি জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। এর পেছনে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং সীমান্ত এলাকার ভৌগোলিক দুর্বলতা বড় ভূমিকা রাখে। তাই শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, কুলাউড়া সীমান্তে গরু চোরাচালানের এই বাড়তি তৎপরতা প্রশাসনের জন্য নতুন করে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যদিও বিজিবি ও পুলিশ তাদের কার্যক্রম জোরদার করেছে, তবুও চোরাকারবারিদের সংগঠিত নেটওয়ার্ক ভাঙতে আরও কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

