প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও শেষ পর্যন্ত বিমানযাত্রা করতে পারেননি সিলেটের এক অন্তঃসত্ত্বা নারী। প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র সঙ্গে না থাকায় তাঁকে বহন করতে আপত্তি জানায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। পরিবারের ওই নারী সদস্যকে ফ্লাইটে যেতে না দেওয়ার পর তাঁর সঙ্গে থাকা অন্য তিন সদস্যও নিজেদের যাত্রা বাতিল করেন। ফলে একই পরিবারের চার যাত্রীর কারও আর নির্ধারিত ফ্লাইটে লন্ডন যাওয়া হয়নি। শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনাটি ঘিরে বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য প্রযোজ্য স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নিয়ম, যাত্রীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে আগাম ধারণা এবং বিমান সংস্থার নিরাপত্তাগত দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশযাত্রার আগে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর শারীরিক অবস্থা, গর্ভাবস্থার সময়কাল এবং চিকিৎসকের পরামর্শসংক্রান্ত নথি সঙ্গে রাখার বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আবারও সামনে এসেছে।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, শনিবার সকাল ১০টা ১০ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-২০১ ফ্লাইটে লন্ডন যাওয়ার কথা ছিল ওই পরিবারের চার সদস্যের। নির্ধারিত সময়ের আগে তাঁরা সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে চেক-ইনসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। এরপর ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষ করে পাসপোর্ট চেকিং পয়েন্টে (পিসিইউ) গেলে তাঁদের যাত্রার বিষয়ে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ওই সময় পরিবারের এক নারী সদস্য নিজেকে ২৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানান। বিমানযাত্রার উপযোগিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র চাওয়া হলে তিনি চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র দেখাতে পারেননি। এ অবস্থায় তাঁর শারীরিক নিরাপত্তা এবং যাত্রাপথে সম্ভাব্য জটিলতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁকে ফ্লাইটে বহন করতে আপত্তি জানান। পরবর্তী সময়ে তাঁকে নির্ধারিত ফ্লাইট থেকে অফলোড করা হয়।
পরিবারের নারী সদস্যকে ছাড়া লন্ডনে যেতে রাজি হননি অন্য তিন যাত্রীও। তাঁরা স্বেচ্ছায় ফ্লাইট থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেন। ফলে চারজনের কারও আর ওই ফ্লাইটে যাত্রা করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ প্রস্তুতি, বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা এবং নির্ধারিত সময়ে বিদেশে পৌঁছানোর পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত স্থগিত হয়ে যায়।
এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের স্টেশন ম্যানেজার শাকিল আহমেদ জানান, বিমানের নিয়ম অনুযায়ী ২৬ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা যাত্রীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হয়। ওই নারী যাত্রীর গর্ভাবস্থার সময় ২৫ সপ্তাহ অতিক্রম করেছিল। কিন্তু তাঁর কাছে চিকিৎসকের কোনো প্রত্যয়নপত্র ছিল না। এ কারণে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় বিমানের ক্রুরা তাঁকে বহন করতে সম্মত হননি।
শাকিল আহমেদ আরও জানান, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র ছাড়া কোনো অন্তঃসত্ত্বা নারীকে বিমানে বহন করার পর যাত্রাপথে শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে বিমান সংস্থাকে বড় ধরনের আর্থিক জরিমানা ও অন্যান্য দায়ের মুখে পড়তে হতে পারে। বিষয়টি যাত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বুঝিয়ে বলা হয়। পরে তাঁরা পরিস্থিতি উপলব্ধি করে নিজেরাই ওই ফ্লাইটে যাত্রা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন।
বিমান সংস্থার এমন সিদ্ধান্তের পেছনে মূল বিবেচ্য বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে যাত্রী ও তাঁর অনাগত সন্তানের নিরাপত্তা। আকাশপথে দীর্ঘ সময় ভ্রমণের ক্ষেত্রে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের শারীরিক অবস্থার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। গর্ভাবস্থার সময়কাল, শারীরিক জটিলতা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং ভ্রমণের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করে বিমান সংস্থাগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম অনুসরণ করে। এসব নিয়মের উদ্দেশ্য হলো যাত্রাপথে মা ও শিশুর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো এবং জরুরি পরিস্থিতি এড়ানো।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, গর্ভাবস্থার ২৬ থেকে ৩২ সপ্তাহের মধ্যে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত চিকিৎসকের দেওয়া ‘ফিট টু ফ্লাই’ সনদ প্রয়োজন। এ সনদে সংশ্লিষ্ট নারী বিমান ভ্রমণের জন্য শারীরিকভাবে উপযুক্ত কি না, তা উল্লেখ থাকতে হয়। বিমানের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, চিকিৎসকের সনদ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুত করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। গর্ভাবস্থার ৩৩ সপ্তাহ থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয় না। তবে একক ও একাধিক গর্ভধারণের ক্ষেত্রে নিয়মের পার্থক্য থাকতে পারে।
এ ধরনের নিয়ম শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং যাত্রীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গর্ভাবস্থায় দীর্ঘ সময় বসে থাকা, শারীরিক অস্বস্তি, পানিশূন্যতা, রক্ত চলাচলে সমস্যা কিংবা আগে থেকে থাকা কোনো জটিলতা ভ্রমণের সময় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক রুটে দীর্ঘ সময় আকাশপথে অবস্থান করতে হলে আগে থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা স্বাভাবিক থাকলেও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতির কারণে চিকিৎসক বিমান ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করতে পারেন।
সিলেটের ওই পরিবারের ঘটনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁরা বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্রের অভাবে সমস্যায় পড়েন। বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে সাধারণত পাসপোর্ট, ভিসা, টিকিট এবং ইমিগ্রেশনসংক্রান্ত নথিপত্র নিয়ে যাত্রীরা আগেভাগে প্রস্তুতি নেন। কিন্তু যাত্রীর বিশেষ শারীরিক অবস্থা থাকলে অতিরিক্ত কিছু কাগজপত্রের প্রয়োজন হতে পারে। এসব বিষয়ে আগে থেকে যথাযথ তথ্য না থাকলে বিমানবন্দরে গিয়ে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের বিমান ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময় শুধু টিকিট কেনা ও ভিসার প্রস্তুতির ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার নিয়মও জেনে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার কত সপ্তাহে চিকিৎসকের সনদ লাগবে, সনদটি কত দিনের মধ্যে ইস্যু করা হতে হবে, বিমান সংস্থার চিকিৎসকের অনুমোদন প্রয়োজন কি না এবং ভ্রমণের সর্বোচ্চ সময়সীমা কত—এসব বিষয় আগেই নিশ্চিত করা উচিত। একই সঙ্গে ভ্রমণের আগে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে মা ও অনাগত সন্তানের স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর কোনো যাত্রীকে ফ্লাইট থেকে অফলোড করার ঘটনা সংশ্লিষ্ট পরিবারের জন্য স্বাভাবিকভাবেই বিব্রতকর ও হতাশাজনক হতে পারে। বিশেষ করে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বিদেশযাত্রার পরিকল্পনা করলে একজন সদস্যের যাত্রা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পুরো পরিকল্পনাই ভেস্তে যেতে পারে। সিলেটের এই ঘটনাতেও দেখা গেছে, পরিবারের একজন সদস্যকে বহন করতে আপত্তি জানানোর পর অন্য তিন সদস্যও তাঁর সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে তাঁদের নির্ধারিত দিনের যাত্রা বাতিল হয়ে যায়।
তবে এ ধরনের পরিস্থিতিতে যাত্রীদের সঙ্গে বিমান সংস্থার কর্মকর্তাদের স্পষ্ট ও সহানুভূতিশীল যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাত্রার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেওয়া গেলে অনেক ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তের বিড়ম্বনা এড়ানো সম্ভব। টিকিট বুকিংয়ের সময় যাত্রীর গর্ভাবস্থার বিষয়টি জানানো, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বিমান সংস্থার সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে অনুমোদন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকলে এ ধরনের সমস্যার ঝুঁকি কমে আসে।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এই ঘটনা বিদেশগামী যাত্রীদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারী, প্রবীণ ব্যক্তি এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ যাত্রীদের ক্ষেত্রে বিমান ভ্রমণের আগে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। শুধু যাত্রার দিন বিমানবন্দরে উপস্থিত হলেই সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রস্তুতি আগেই সম্পন্ন করা উচিত।
সব মিলিয়ে, সিলেটের ওই পরিবারের লন্ডনযাত্রা শেষ মুহূর্তে স্থগিত হওয়ার ঘটনা যেমন তাঁদের ব্যক্তিগত ভোগান্তির বিষয়, তেমনি বিমান ভ্রমণে স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা ও নিয়ম মেনে চলার গুরুত্বও সামনে এনেছে। তবে এ ঘটনায় ওই নারী বা তাঁর অনাগত সন্তানের কোনো শারীরিক জটিলতা দেখা দিয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে বিমান সংস্থার নিয়ম সম্পর্কে যাত্রীদের আগাম সচেতনতা বাড়ানো এবং টিকিট বুকিংয়ের সময় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা নিশ্চিত করা জরুরি।

