ফুটপাতে শ্রমিককে চাপা, ৯ লাখে আপস

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নেওয়ার সময় প্রাইভেটকারের চাপায় নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীমের মৃত্যুর ঘটনায় মামলাটি নতুন মোড় নিয়েছে। নিহতের পরিবারের সঙ্গে অভিযুক্ত কিশোরের পরিবারের পক্ষের ৯ লাখ টাকায় আপস-মীমাংসা হয়েছে বলে আদালতে দাবি করেছেন কিশোরের আইনজীবী।

বৃহস্পতিবার আদালতে দেওয়া জামিন আবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয়ভাবে আপসের মাধ্যমে কিশোরের পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে নগদ ৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। আইনজীবী আলমগীর হোসেন সাংবাদিকদেরও বলেন, দাফন-কাফনের জন্য ১ লাখ টাকা এবং মেহেদীর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় আরও ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। তবে নিহতের ভাই ও মামলার বাদী মোক্তাদীর ইসলাম আপসের বিষয়টি স্বীকার করলেও টাকার পরিমাণ সম্পর্কে তিনি নিজে নিশ্চিত নন বলে জানিয়েছেন।

ঘটনার পর থেকে মামলাটি ঘিরে যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছিল, আপসের খবর সেগুলোকে আরও আলোচনায় এনেছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার সময় গাড়ির চালকের আসনে কে ছিলেন, মামলায় কাকে আসামি করা হয়েছে এবং পরে কিশোরের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয় এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

যেভাবে প্রাণ গেল মেহেদীর

গত ২২ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর সড়কে দুর্ঘটনাটি ঘটে। ২৪ বছর বয়সী মেহেদী হাসান মীম ওই এলাকায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। কাজের ফাঁকে তিনি নির্মাণাধীন একটি স্থাপনার বিপরীতে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।

এ সময় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে যায় এবং মেহেদীকে চাপা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার পর গাড়িটি সড়কের একটি বাতির খুঁটিতে ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়।

মেহেদীর মৃত্যুর পর তার পরিবারের কাছে নেমে আসে শোকের ছায়া। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় গ্রামের এই তরুণ ঢাকায় কাজ করে পরিবারের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছিলেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে পরিবারের সদস্যদের বরাতে বলা হয়েছে, মেহেদীর স্বপ্ন ছিল টাকা জমিয়ে পরিবারের ঘর মেরামত করা।

চালকের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন গাড়ির চালকের আসনে থাকা এক কিশোরকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। কিন্তু প্রাথমিকভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ওই রাতেই চাচার জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

পরদিন নিহত মেহেদীর বড় ভাই মোক্তাদীর ইসলাম গুলশান থানায় মামলা করেন। মামলায় গাড়িটির চালক হিসেবে আকাশ মারক নামের ৪৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। পুলিশ জানিয়েছিল, আকাশ মারক ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন। মামলায় তখন গাড়িতে থাকা কিশোরের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর দুর্ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন ভিডিও সামনে আসে। পুলিশ জানায়, ফুটেজ বিশ্লেষণে দুর্ঘটনার পর গাড়ির ড্রাইভিং সিটের দরজা দিয়ে কিশোরটিকে বের হতে দেখা গেছে। তদন্তে তার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর বুধবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় প্রকৃতপক্ষে কে গাড়ি চালাচ্ছিল, তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। ফলে আদালতে উপস্থাপিত অভিযোগ বা তদন্তের প্রাথমিক তথ্যকে চূড়ান্তভাবে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই বিষয়টির চূড়ান্ত নির্ধারণ হওয়ার কথা।

আদালতে কিশোর, কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ

বৃহস্পতিবার কিশোরটিকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার এসআই মো. আরিফীন ইসলাম তাকে আটক রাখার আবেদন করেন। আদালতে দেওয়া আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় কিশোরটির সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে এবং তদন্তের স্বার্থে তাকে হেফাজতে রাখা প্রয়োজন।

আদালতের আদেশে তাকে গাজীপুরের টঙ্গী কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। কিশোর হওয়ায় তার ক্ষেত্রে শিশু আইন অনুযায়ী বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

এর মধ্যেই কিশোরের আইনজীবী আদালতে ৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে জামিনের আবেদন করেন। আইনজীবীর দাবি, আপসনামায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে স্বাক্ষর করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত কিশোর জামিনে মুক্তি পেলে বা মামলায় খালাস পেলে তাদের আপত্তি থাকবে না। তবে আপস হয়েছে বলেই মামলার তদন্ত বা আদালতের বিচারিক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায়—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

বাদীর বক্তব্যেও আপসের বিষয় নিশ্চিত

মামলার বাদী ও নিহতের ভাই মোক্তাদীর ইসলাম সাংবাদিকদের কাছে আপসের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, কত টাকায় আপস হয়েছে তা তিনি জানেন না; তার মামা এ বিষয়ে জানেন।

অন্যদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আরিফীন ইসলাম বলেছেন, আপসের বিষয়টি তার জানা নেই। তদন্তে এর প্রভাব পড়বে কি না জানতে চাইলে তিনি জানিয়েছেন, পুলিশ তাদের মতো করে তদন্ত চালিয়ে যাবে।

এ অবস্থায় মামলার দুটি বিষয় পাশাপাশি সামনে এসেছে। একদিকে নিহতের পরিবারের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার কথা আদালতে তুলে ধরা হয়েছে, অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তদন্ত চলমান থাকবে। ফলে আপসের পর মামলাটি কোন পর্যায়ে যাবে এবং অভিযুক্ত কিশোরের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ কী হবে, সেটি আদালতের প্রক্রিয়া ও তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।

মেহেদীর পরিবারের জন্য ৯ লাখ টাকা কতটা সহায়তা

মেহেদীর মতো নির্মাণশ্রমিকের আকস্মিক মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের ভবিষ্যৎ, বাবা-মায়ের নির্ভরতা এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক পরিকল্পনা। আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, আপসের অর্থের একটি অংশ দাফন-কাফনের ব্যয় এবং বাকি অর্থ বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে।

তবে একটি দুর্ঘটনায় একজন তরুণের প্রাণহানি কোনো আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে ফিরে আসে না। একই সঙ্গে নিহত পরিবারের আর্থিক বাস্তবতাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এ ধরনের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ, তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়া—প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনার প্রয়োজন হয়।

বারিধারার ঘটনাটি তাই কেবল একটি সড়ক দুর্ঘটনার খবর নয়; এটি সড়ক নিরাপত্তা, চালকের দায়িত্ব, অপ্রাপ্তবয়স্কের গাড়ি চালানো নিয়ে প্রশ্ন, দুর্ঘটনার পর আইনি ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ন্যায়বিচার—এসব বিষয়কেও সামনে এনেছে।

তদন্তেই স্পষ্ট হবে প্রকৃত দায়

ঘটনার পর মামলায় প্রথমে আকাশ মারকের নাম আসা এবং পরে সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে কিশোরকে গ্রেপ্তার করা—এই দুই ধাপের কারণে দুর্ঘটনার প্রকৃত চালক নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পুলিশও জানিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করা হবে।

বর্তমানে কিশোরের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্ত কর্মকর্তার আদালতে দেওয়া আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়েছে বলা যায় না। একইভাবে আপসনামা থাকলেও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া ও তদন্তের আইনগত অবস্থান আলাদাভাবে বিবেচিত হবে।

মেহেদী হাসান মীমের মৃত্যুতে একটি পরিবারের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। এখন এই ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে গাড়িটি কে চালাচ্ছিল, দুর্ঘটনার কারণ কী ছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কী এবং আইন অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ও আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমেই স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

শিকে বিরল অভ্যর্থনা, ট্রাম্পের সঙ্গে বড় বৈঠক আজ

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক-জুয়া ঠেকাতে কমিটি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ৫ প্রস্তাব

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট সীমান্তে গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হাম-উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালে ৬৩২

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

শিকে বিরল অভ্যর্থনা, ট্রাম্পের সঙ্গে বড় বৈঠক আজ

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক-জুয়া ঠেকাতে কমিটি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ৫ প্রস্তাব

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট সীমান্তে গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হাম-উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালে ৬৩২

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ফ্ল্যাটে ডিবির অভিযান, আটক ৬

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

উচ্চ বেতনের প্রলোভনে ভারতে যাওয়ার পথে সিলেটে আটক ৭

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

এ বছর শুরু হচ্ছে না স্থানীয় সরকার নির্বাচন

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ