প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার চাপ—সব মিলিয়ে নতুন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে সরকার দেশের চার প্রধান জ্বালানি পণ্যের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। নতুন দরে ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
জ্বালানির এই মূল্য সমন্বয় শুধু পেট্রোল পাম্পের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ডিজেলনির্ভর পরিবহন, কৃষির সেচ ও যান্ত্রিকীকরণ, শিল্পের উৎপাদন এবং পণ্য সরবরাহব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ফলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলের অনেকে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, বিপুল আর্থিক ক্ষতি এবং সীমান্তপথে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।
সরকারের হিসাবে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশে কম দামে জ্বালানি বিক্রি করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্য, পরিবহন ও বিমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির কারণে সরকারকে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সাধারণ মানুষের ওপর এর চাপের বিষয়টি স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
সরকারের ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম ও ফ্রেইট চার্জ বাড়ার পাশাপাশি দেশে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি বিক্রি অব্যাহত রাখলে বিপিসির আর্থিক ক্ষতি আরও বাড়তে পারত। তাই একদিকে বিপিসির লোকসান কমানো, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সীমান্তে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যেই নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ছে পরিবহন খাতে। দেশের অধিকাংশ বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও নৌযানে ডিজেলের ব্যবহার থাকায় জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। এরই মধ্যে বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিআরটিএর সঙ্গে পরিবহন মালিকদের আলোচনায় ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাবও এসেছে। পরে ২২ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে দূরপাল্লা ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহানগরের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা করে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে সাধারণ যাত্রীর দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর সরাসরি পড়তে শুরু করেছে।
পরিবহন ব্যয় বাড়ার প্রভাব আবার পণ্য সরবরাহব্যবস্থায়ও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য পরিবহন ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় এরই মধ্যে বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব দেখা গেছে। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির পর বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলো কয়েকটি সেবার চার্জ প্রায় ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে নৌপথের পণ্য পরিবহন ও অন্যান্য লজিস্টিক সেবায়ও ভাড়া সমন্বয়ের আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই পরিস্থিতির পরবর্তী ধাক্কা আসতে পারে কৃষিতে। দেশের কৃষিতে সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে কৃষিপণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডিজেলচালিত সেচপাম্প ও কৃষিযন্ত্রের ব্যয় বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচও বাড়তে পারে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কৃষক পর্যায়ে তার প্রভাব পড়বে এবং পরবর্তী সময়ে বাজারে খাদ্যপণ্যের দামের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুনও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে কৃষির সেচ, যান্ত্রিকীকরণ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন।
শিল্প খাতেও পরিস্থিতি সহজ নয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে অনেক কারখানাকে বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে শুধু পণ্য পরিবহনের খরচ নয়, উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতা রয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে কারখানার উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং এর প্রভাব রপ্তানিতেও পড়তে পারে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ঘাটতির সময় কারখানাগুলোকে জেনারেটর চালাতে হয়, ফলে ডিজেলের বাড়তি দাম সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ে যোগ হবে।
অর্থনীতিতে এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হতে পারে মূল্যস্ফীতির ওপর। জ্বালানি হলো প্রায় সব ধরনের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একটি পণ্য উৎপাদনের পর সেটি কারখানা থেকে গুদাম, গুদাম থেকে পাইকারি বাজার এবং সেখান থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে একাধিক পর্যায়ে পরিবহন প্রয়োজন হয়। প্রতিটি পর্যায়ে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে তার একটি অংশ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে জ্বালানির দাম বাড়লেই সব পণ্যের দাম একই হারে বাড়বে—এমন সরল সম্পর্ক নেই। পণ্যের দাম নির্ভর করে উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ, চাহিদা, আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, বাজার প্রতিযোগিতা এবং ব্যবসায়ীদের মূল্য নির্ধারণের ওপর। ফলে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কোন পণ্যে কতটা পড়বে, তা সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।
এখানেই সরকারের বাজার তদারকির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার সুযোগ নিয়ে কোনো ব্যবসায়ী যদি অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ান বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন, তাহলে প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে বাজারদরের পার্থক্য আরও বাড়তে পারে। ফলে মূল্যবৃদ্ধির বাস্তব কারণ এবং ব্যবসায়িক সুযোগ নেওয়ার প্রবণতার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের পরামর্শও মূলত এই জায়গাতেই। জ্বালানির দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন থাকলেও এর প্রভাব যাতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্তভাবে না পড়ে, সে জন্য পরিবহনভাড়া, বাজারদর এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, আয়ের তুলনায় ব্যয় যদি দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে পরিবারের হাতে থাকা অর্থের প্রকৃত মূল্য কমে যায়। যাতায়াতের খরচ, খাদ্যপণ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যয়—সব মিলিয়ে মাসিক বাজেটে চাপ বাড়ে। বিশেষ করে যাদের আয় নির্দিষ্ট এবং সঞ্চয়ের সুযোগ সীমিত, তাদের ওপর এই ধরনের ব্যয়ের ধাক্কা তুলনামূলক বেশি অনুভূত হতে পারে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতির পুরো চিত্র বুঝতে শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে আলাদা করে দেখলে হবে না। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, জ্বালানি আমদানির ব্যয়, দেশের শিল্প ও পরিবহন খাতের সক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বিষয়গুলো পরস্পর সম্পর্কিত। ফলে জ্বালানির দাম সমন্বয়ের পর এর প্রভাব কোন খাতে কতটা ছড়াবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজার, সরবরাহব্যবস্থা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর।
সব মিলিয়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একই সঙ্গে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ভোক্তা বাজারে চাপ তৈরি করেছে। সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হবে একদিকে বিপিসির আর্থিক ক্ষতি ও জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। আর সাধারণ মানুষের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—জ্বালানির এই বাড়তি ব্যয়ের কতটা শেষ পর্যন্ত তাদের দৈনন্দিন জীবনের খরচে গিয়ে যোগ হবে। সেই উত্তর অনেকটাই নির্ভর করবে বাজার তদারকি, পরিবহনভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর আগামী কয়েক সপ্তাহে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয় তার ওপর।


