রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ৫ প্রস্তাব

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করতে হবে।

জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে তিনি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সামনে পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে দ্রুত প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

স্থানীয় সময় ২৩ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ১১ নম্বর কক্ষে ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: অ্যা রিনিউড কল ফর অ্যা ডিউরেবল সলিউশন ফ্রম প্রোট্র্যাক্টেড ডিসপ্লেসমেন্ট, উইথ জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক, রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও জবাবদিহির দিকগুলো গুরুত্ব পায়।

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম প্রস্তাব হলো, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় হতে হবে এবং নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে এমন পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে, যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজভূমিতে ফিরে যেতে পারেন।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি। প্রত্যাবাসন শুধু মানুষকে সীমান্তের ওপারে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়—ফিরে যাওয়া মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের নিশ্চয়তাও এর সঙ্গে যুক্ত বলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে।

তৃতীয় প্রস্তাবে তিনি রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, আন্তর্জাতিক সহায়তার ক্ষেত্রে সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

চতুর্থ প্রস্তাবের কেন্দ্রে রয়েছে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি। রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি ন্যায়বিচারের বিষয়টিকেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

পঞ্চম প্রস্তাবে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান তিনি। মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরনের আন্তঃসীমান্ত অপরাধ রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ ক্ষেত্রে শুধু একটি দেশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতির দীর্ঘ ইতিহাসও তুলে ধরেন। ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বড় ধরনের আগমন ঘটেছে। পরবর্তী দশকগুলোতেও একাধিক দফায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে ব্যাপক সহিংসতার পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করলে সংকট নতুন মাত্রা পায়।

বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের মে মাসের পরিস্থিতি প্রতিবেদনে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত থাকার কথা বলা হয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী এই পরিস্থিতির ফলে কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলোতে নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নও মানবিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ২০২৫–২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনাতেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, জীবনরক্ষাকারী সহায়তা, শিক্ষা ও জীবিকায়নের পাশাপাশি স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তবে এই মানবিক কার্যক্রমের অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় প্রায় ৯৩৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন ধরা হয়েছিল। ২০২৬ সালের পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ কমিয়ে প্রায় ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মানবিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের পরিকল্পনার আওতায় কক্সবাজার, ভাসানচর এবং সংশ্লিষ্ট আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৬ লাখ মানুষের প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্য রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী এই অর্থায়ন সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ কমে যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকা উচিত নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘদিন ধরে যে মানবিক দায়িত্ব রয়েছে, সেটি একা বাংলাদেশের পক্ষে অনির্দিষ্টকাল বহন করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা বন্ধ বা কমে গেলে শিবিরগুলোতে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাসহ মৌলিক সেবায় আরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপও বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মধ্যে মানবপাচার, মাদকপাচার ও অবৈধ অভিবাসনের মতো ঝুঁকি বাড়তে পারে—এমন উদ্বেগও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। মানবিক সংকটের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তার এই যোগসূত্র বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক অংশীজনদের আরও সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের জন্য নিজভূমিতে ফিরে যাওয়ার মতো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ এখনো নিশ্চিত হয়নি। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে প্রত্যাবাসনের আগে নিরাপত্তা, অধিকার ও নাগরিক মর্যাদার প্রশ্ন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই হলো, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। জাতিসংঘ ও অংশীদারদের ২০২৫–২৬ সালের যৌথ পরিকল্পনাতেও রোহিঙ্গাদের দ্রুত, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি, পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা এবং প্রত্যাবাসনের বাস্তব প্রস্তুতির মতো বিষয়গুলো এখনো সংকট সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।

জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কেবল সহমর্মিতা প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সংকটের মূল কারণ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল—রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত অবস্থাকে দীর্ঘায়িত না করে এমন একটি প্রক্রিয়া তৈরি করা, যাতে তারা নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে নিজভূমিতে ফিরতে পারেন।

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে বাংলাদেশের জন্য মানবিক সহায়তা যেমন জরুরি, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে প্রত্যাবাসনের অনুকূল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিবেশ তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ প্রস্তাব সেই দুই দিক—মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথে আন্তর্জাতিক চাপ ও সহযোগিতা বাড়ানো—একসঙ্গে সামনে এনেছে। এখন এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনরা কতটা সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেটিই রোহিঙ্গা সংকটের পরবর্তী গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

শিকে বিরল অভ্যর্থনা, ট্রাম্পের সঙ্গে বড় বৈঠক আজ

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক-জুয়া ঠেকাতে কমিটি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ফুটপাতে শ্রমিককে চাপা, ৯ লাখে আপস

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট সীমান্তে গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হাম-উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালে ৬৩২

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

শিকে বিরল অভ্যর্থনা, ট্রাম্পের সঙ্গে বড় বৈঠক আজ

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক-জুয়া ঠেকাতে কমিটি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ফুটপাতে শ্রমিককে চাপা, ৯ লাখে আপস

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট সীমান্তে গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হাম-উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালে ৬৩২

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ফ্ল্যাটে ডিবির অভিযান, আটক ৬

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

উচ্চ বেতনের প্রলোভনে ভারতে যাওয়ার পথে সিলেটে আটক ৭

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

এ বছর শুরু হচ্ছে না স্থানীয় সরকার নির্বাচন

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ