প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মাত্র চার মাস ও ১০ মাস বয়সী দুই শিশুর মৃত্যু নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন আরও ১৫৫ জন। ফলে বিভাগজুড়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩২ জনে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল ও হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়।
মারা যাওয়া শিশু দুটির একজন সিলেট সদর এলাকার চার মাস বয়সী আদিয়ান। তাকে হামের উপসর্গ নিয়ে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। অন্য শিশুটি হবিগঞ্জ সদর এলাকার ১০ মাস বয়সী ইয়াসিন। সেও হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। পরে তার মৃত্যু হয়।
দুই শিশুর মৃত্যু যেন আবারও সামনে আনল সিলেট বিভাগের চলমান হাম পরিস্থিতির আরেকটি মানবিক দিক। হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসাধীন থাকা শিশুদের মধ্যে অনেকেই খুব অল্প বয়সী। পরিবারের সদস্যদের জন্য একদিকে সন্তানের চিকিৎসার ব্যয় ও উদ্বেগ, অন্যদিকে রোগের দ্রুত অবনতির আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ হিসাব বলছে, চলতি বছরে সিলেট বিভাগে হাম ও হাম-উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ১৭৫ জনে পৌঁছেছে। তবে এই সংখ্যাকে পুরোপুরি নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ১৭৫ জনের মধ্যে ১০ জনের পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছিল। অন্য ১৬৫ জন হাম বা হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৫৫ জনকে হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে সিলেট বিভাগের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ৬৩২ জন সন্দেহজনক হাম রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৮৫ জন, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৫৫ জন এবং সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৬০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেট বিভাগে পরীক্ষাগারে ১ হাজার ৫৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এর বাইরে বিপুলসংখ্যক রোগী হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
মাত্র এক দিন আগেও পরিস্থিতির চিত্র ছিল উদ্বেগজনক। ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, আগের ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে হাম সন্দেহে ১৬৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। তখন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ছিল ৬০০। এক দিনের ব্যবধানে নতুন করে ১৫৫ জন ভর্তি হওয়ায় সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে।
দেশজুড়ে চলতি বছরের হামের বিস্তারও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আক্রান্তদের বড় অংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।
এই পরিস্থিতিতে সরকার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। প্রথম ধাপে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করা হয়। পরে কর্মসূচি দেশব্যাপী সম্প্রসারিত করা হয়।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের হামের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে শিশুদের মধ্যে টিকাদানের ঘাটতি বা ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সংস্থাটি জানিয়েছে, দুই ডোজ হামের টিকার কভারেজ কমে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। হাম নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি পর্যায়ে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ব্যাপক টিকাদান। দুই ডোজ টিকা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে যেসব শিশু ইতোমধ্যে অসুস্থ হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা করাও জরুরি।
সিলেটের হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তাতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ পড়ছে। গত কয়েকদিনের তথ্যেই দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন নতুন করে বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোর শয্যা, চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, হাম আক্রান্ত বা সন্দেহজনক শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতা থাকলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে। স্থানীয় প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের বরাতে বলা হয়েছে, হাম-উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া অনেক শিশুর টিকাদান সম্পূর্ণ ছিল না। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে পুষ্টিহীনতা, নিউমোনিয়া, হৃদরোগ বা জন্ডিসের মতো অন্যান্য জটিলতার কথাও উঠে এসেছে। তবে প্রতিটি মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ চিকিৎসা মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের আওতায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। কোনো শিশুর জ্বর, শরীরে র্যাশ, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা হামের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অসুস্থ শিশুকে অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখার বিষয়েও চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
সিলেটের সর্বশেষ পরিস্থিতি বলছে, হাম এখনো নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। একদিকে প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, অন্যদিকে মৃত্যুর তালিকায় যুক্ত হচ্ছে অল্প বয়সী শিশুদের নাম। চার মাসের আদিয়ান ও ১০ মাসের ইয়াসিনের মৃত্যু সেই উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ হিসাবে বর্তমানে ৬৩২ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসাসেবা, রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি এবং টিকাদান কার্যক্রম একসঙ্গে জোরদার রাখার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শিশুদের নিরাপত্তায় পরিবার, স্বাস্থ্যকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


