নোট ছাপাতে এক বছরে খরচ বেড়ে ৪৫৯ কোটি টাকা

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন

দেশে নতুন ব্যাংকনোট ছাপানোর ব্যয় এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অডিটরস রিপোর্ট ও অডিটেড ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টস অনুযায়ী, গত অর্থবছরে নোট মুদ্রণ বাবদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খরচ হয়েছে ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ২৩৪ কোটি ৭৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে নোট ছাপানোর ব্যয় বেড়েছে ২২৪ কোটি ১৪ লাখ ৮ হাজার টাকা, যা প্রায় ৯৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি।

ব্যাংকনোট ছাপানো সাধারণ কোনো মুদ্রণ কার্যক্রম নয়। একটি দেশের অর্থনীতিতে প্রচলিত প্রতিটি নোটের নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে বিশেষ ধরনের কাগজ, নিরাপত্তা কালি এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উপকরণ প্রয়োজন হয়। পুরোনো ও ব্যবহারের অনুপযোগী নোট বাজার থেকে তুলে নেওয়ার পর তার পরিবর্তে নতুন নোট ছাপিয়ে সরবরাহ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত মুদ্রা ব্যবস্থাপনার অংশ। এই প্রক্রিয়ার ব্যয়ই গত অর্থবছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশে ব্যাংকনোট মুদ্রণের দায়িত্বে রয়েছে দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড বা এসপিসিবিএল। তবে নোট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কাগজ, বিশেষ ধরনের কালি এবং অন্যান্য উপকরণের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিকভাবে তালিকাভুক্ত বিশেষায়িত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। ফলে নোট ছাপানোর মোট ব্যয়ের একটি বড় অংশ নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, টাকা ছাপানোর জন্য ব্যবহৃত কাগজ ও কালি সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্যের মতো নয়। এগুলো বিশেষভাবে তৈরি করতে হয় এবং এ ধরনের উপকরণ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও বিশ্ববাজারে তুলনামূলকভাবে সীমিত। এ কারণে সরবরাহকারীদের সঙ্গে দর-কষাকষির সুযোগও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত থাকে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, নোট তৈরিতে ব্যবহৃত কাগজ ও কালি বিশেষ মানের হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এগুলোর দাম বেশি। বিশ্বের সব দেশ এ ধরনের নিরাপত্তা কাগজ উৎপাদন করে না। ফলে যেসব প্রতিষ্ঠান এই উপকরণ সরবরাহ করে, তাদের ওপর নির্ভরশীলতা তুলনামূলক বেশি। সরবরাহকারীদের নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে দর-কষাকষির সুযোগ সীমিত থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি নোট মুদ্রণের ব্যয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মকর্তা নোট ছাপানোর ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক পরিস্থিতিকেও অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে সরবরাহব্যবস্থায় সংকট তৈরি হওয়ায় কাঁচামাল সংগ্রহ ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারসহ অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হওয়ায় নোট ছাপানোর সামগ্রিক খরচ বেড়েছে।

তবে নোটের নকশা পরিবর্তনের কারণে ব্যয় বেড়েছে কি না, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন না বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র। তার মতে, নতুন নকশার কারণে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ খুব বেশি নয়। নতুন নকশা চালুর কারণে মুদ্রণ কার্যক্রমে কিছুটা জটিলতা তৈরি হলেও সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধির মূল কারণ কাগজ ও কালির দাম বৃদ্ধি।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে প্রচলিত বিভিন্ন মূল্যমানের ব্যাংকনোটের নকশা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আগের নোটগুলোর মধ্যে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতির পরিবর্তে নতুন নকশায় নোট চালুর প্রক্রিয়া শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন মূল্যমানের নোটের নকশা প্রণয়ন ও মুদ্রণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।

নতুন নকশার নোট বাজারে আনার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য হলো, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নোট ছাপানোর ব্যয় বাড়ার সঙ্গে নতুন নোটের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ার সরাসরি সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ শুধু বেশি সংখ্যক নোট ছাপানোর কারণে গত অর্থবছরে প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় হয়েছে—এমনটি মনে করছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নোট মুদ্রণের ব্যয়ের সাম্প্রতিক প্রবণতা দেখলেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নোট ছাপাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যয় হয়েছিল ৩৩৭ কোটি ২৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। তার আগের ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যয় ছিল ৩৭৪ কোটি ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই ব্যয় দাঁড়িয়েছিল ৩৮৪ কোটি ২৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা। এসব পরিসংখ্যানের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ব্যয় গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে নোট মুদ্রণের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি শুধু বাংলাদেশে অর্থ ছাপানোর পরিমাণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা, কাঁচামালের দাম এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরও সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা কাগজ ও বিশেষ কালি উৎপাদনের বাজার সীমিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব এড়ানো কঠিন।

তবে নোট মুদ্রণের ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিনিময় হার কতটা ভূমিকা রেখেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন শেষে আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের গড় বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৭৭ পয়সা। এক বছর পর ২০২৬ সালের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২২ টাকা ৮৫ পয়সায়। অর্থাৎ এক বছরে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে মাত্র ৮ পয়সা বা প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।

এই হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। ফলে নোট ছাপানোর ব্যয় প্রায় ৯৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার পেছনে শুধু বিনিময় হারকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজ ও কালির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নোট ছাপানোর ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি দৃশ্যমান কোনো ব্যয় না হলেও এর সঙ্গে দেশের মুদ্রা ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক জড়িত। বাজারে থাকা পুরোনো, ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যবহারের অনুপযোগী নোট নিয়মিতভাবে তুলে নিয়ে তার পরিবর্তে নতুন নোট সরবরাহ করতে হয়। এতে একদিকে মুদ্রার মান ও নিরাপত্তা বজায় থাকে, অন্যদিকে ব্যাংক ও সাধারণ মানুষের লেনদেন ব্যবস্থাও সচল থাকে।

নতুন নোটে নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা, জাল নোট প্রতিরোধ, নোটের স্থায়িত্ব বাড়ানো এবং আধুনিক নকশা বাস্তবায়নের মতো বিষয়গুলোও মুদ্রণ ব্যবস্থাপনার অংশ। ফলে নোট তৈরির ব্যয়কে কেবল কাগজ ও কালির মূল্য দিয়ে বিচার করা যায় না। এর সঙ্গে নিরাপত্তা প্রযুক্তি, বিশেষায়িত উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার ব্যয়ও যুক্ত থাকে।

তবে এক বছরে নোট মুদ্রণের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যখন একই সময়ে নোট ছাপানোর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই জানাচ্ছে, তখন কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদন ব্যবস্থার ব্যয় কীভাবে এতটা বেড়েছে, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে অডিটরস রিপোর্ট ও আর্থিক বিবরণীতে প্রকাশিত তথ্য ভবিষ্যতে নোট মুদ্রণ ব্যয়ের প্রবণতা বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজ ও কালির দাম, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, ক্রয় প্রক্রিয়া, উৎপাদন ব্যয় এবং নতুন নকশা বাস্তবায়নের প্রভাব—এসব বিষয় আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হলে ব্যয় বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ আরও পরিষ্কার হবে।

সব মিলিয়ে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে ব্যাংকনোট মুদ্রণের পেছনে প্রায় ৪৫৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৯৫ শতাংশেরও বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে বৈশ্বিক বাজারে কাগজ ও কালির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থার সংকটকে দেখছে। নতুন নোটের নকশা পরিবর্তন ও বিনিময় হারের প্রভাব থাকলেও সেগুলোকে প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। ফলে ভবিষ্যতে নোট মুদ্রণের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা ও বিশেষায়িত উপকরণের বাজার পরিস্থিতিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

বাঁধনকে হেনস্তা: আওয়ামী লীগকে ‘মাফিয়া গ্যাং’ বললেন উপদেষ্টা

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

পানির ন্যায্য বণ্টনে ভারতের প্রতি রাষ্ট্রপতির আহ্বান

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে প্রথম দিনে ২৫০ কোটি টাকা ফেরত

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাতিসংঘ অধিবেশনে আজ সভাপতির দায়িত্ব নেবেন খলিলুর রহমান

প্রকাশ:  ০৮ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার ৯ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

বাঁধনকে হেনস্তা: আওয়ামী লীগকে ‘মাফিয়া গ্যাং’ বললেন উপদেষ্টা

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

পানির ন্যায্য বণ্টনে ভারতের প্রতি রাষ্ট্রপতির আহ্বান

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে প্রথম দিনে ২৫০ কোটি টাকা ফেরত

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাতিসংঘ অধিবেশনে আজ সভাপতির দায়িত্ব নেবেন খলিলুর রহমান

প্রকাশ:  ০৮ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার ৯ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভেনিসে হেনস্তার শিকার অভিনেত্রী বাঁধন, থানায় অভিযোগ

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

আযাদের আপিল শুনানি চার সপ্তাহ মুলতবি

প্রকাশ:০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

দেশে ফেরার পথে সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ প্রবাসী নিহত

প্রকাশ:  ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ