প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে জাপান। একই সঙ্গে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সংকট সমাধানে ধৈর্য ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে দুই দেশের আলোচনায়।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন মিয়ানমারে জাতীয় পুনর্মিলনবিষয়ক জাপান সরকারের বিশেষ দূত ও নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়া। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট, মিয়ানমারের জাতীয় পুনর্মিলন প্রক্রিয়া, মানবিক সহায়তা, প্রত্যাবাসন এবং প্রত্যাবাসনের পর পুনর্বাসনসহ বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকের শুরুতে ইয়োহেই সাসাকাওয়া প্রধানমন্ত্রীকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে কাজ করছেন। মিয়ানমারে জাতীয় পুনর্মিলন প্রক্রিয়ায় জাপান সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে তাঁর ভূমিকা ও দায়িত্ব সম্পর্কেও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন তিনি।
আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় মানবিক ও জাতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ওপর যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে, তার কথাও প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জনবহুল বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। কিন্তু সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও ক্রমশ বাড়ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জাপানের মানবিক সহায়তা ও সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই সংকট শুধু বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, মানবিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তির বিষয়ও জড়িত। তাই সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ও সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ইয়োহেই সাসাকাওয়াকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে তাঁর অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। বাংলাদেশের অবস্থান হলো, রোহিঙ্গাদের এমন পরিবেশে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হবে যেখানে তারা নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবেন। জোরপূর্বক বা অনিরাপদ প্রত্যাবাসন কোনো স্থায়ী সমাধান তৈরি করবে না বলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে গেলে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উন্নতির সুযোগ তৈরি হবে। প্রত্যাবাসনের পর মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে বাংলাদেশ প্রস্তুত। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত সহায়তা প্রয়োজন হবে।
ইয়োহেই সাসাকাওয়া বৈঠকে জানান, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তাঁর মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মিয়ানমার সরকার সংকট সমাধানের বিষয়ে আন্তরিক বলে তিনি মনে করেন। তবে রাখাইন প্রদেশের বর্তমান জটিল পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাস্তব অগ্রগতি অর্জনে সময় লাগতে পারে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা বাস্তবতা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে বলেও আলোচনায় উঠে আসে।
জাপানের বিশেষ দূত একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জন্য জাপান সরকারের মানবিক সহায়তা ও বিভিন্ন অনুদানের বিষয় তুলে ধরেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংকটে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক সহায়তার গুরুত্ব রয়েছে। তবে মানবিক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়—এমন বাস্তবতার কারণে প্রত্যাবাসন ও রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
বৈঠকে শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর না করে বহুপক্ষীয় উদ্যোগ আরও জোরদার করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘ, আঞ্চলিক শক্তি এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও সক্রিয় হতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপ ও সহযোগিতার সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করেছে। কক্সবাজারে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বসবাস স্থানীয় অবকাঠামো, পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংকট যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী—উভয়ের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবাসনকে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ শুরু থেকেই বলে আসছে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ। তাদের নিজস্ব ভূমি, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আনতে পারবে না।
বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুর পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানান। বিশেষ করে শিল্প, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে জাপানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে আলোচনায় উঠে আসে।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে একটি ভ্যাকসিন উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনে জাপানের সহযোগিতাও চান। স্বাস্থ্য খাতে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় টিকা ও চিকিৎসা উপকরণের সরবরাহ আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ইয়োহেই সাসাকাওয়া এ বিষয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করার আশ্বাস দেন।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টিও বৈঠকে আলোচিত হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে জটিলতার মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ মনে করে, প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে দায়িত্বশীল ও কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও জাতীয় পুনর্মিলন প্রক্রিয়াও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার দীর্ঘদিনের মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন এবং বাংলাদেশ সফরের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান। অন্যদিকে জাপানের বিশেষ দূত রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তাঁর অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানোর আশ্বাস দেন। ফলে বৈঠকটি কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ না হয়ে দীর্ঘদিনের এই মানবিক সংকটের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে দুই পক্ষের মতবিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে, জাপানের বিশেষ দূতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক দিকের পাশাপাশি এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরতে পারবেন। আর সেই প্রত্যাবাসন টেকসই করতে মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনার সমন্বয় জরুরি। জাপানের মতো বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশীদার দেশগুলোর সক্রিয় ভূমিকা সেই প্রচেষ্টাকে আরও কার্যকর করতে পারে।


