প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের ক্রীড়াঙ্গনে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে জেলা ক্রীড়া সংস্থার ৯ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। নতুন এই কমিটিতে সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে আহ্বায়ক এবং জেলা দলের সাবেক খেলোয়াড় রেজাউল করিম নাচনকে সদস্য সচিব করা হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী পরিচালক দৌলতুজ্জামান খান এনডিসির স্বাক্ষরিত এক পত্রে সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটি অনুমোদনের বিষয়টি জানানো হয়। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনায় নতুন একটি সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি হলো।
নতুন ৯ সদস্যের কমিটিতে সিলেটের পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক, জেলা ক্রীড়া অফিসার এবং স্থানীয় ক্রীড়াবিদ মকসুদ আহমদ সদস্য হিসেবে রয়েছেন। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, সমাজসেবা, ক্রীড়া প্রশাসন এবং স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিনিধিত্ব থাকায় কমিটিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটেছে।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অনুমোদনপত্রে বলা হয়েছে, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় উল্লেখিত স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ওপর অর্পিত ক্ষমতা অনুসরণ করে সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পরিষদের চেয়ারম্যানের অনুমোদনের ভিত্তিতেই এই কমিটি গঠিত হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার মতো একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কেবল মাঠের খেলা আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরি, বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, ক্রীড়া অবকাঠামোর ব্যবহার ও উন্নয়ন এবং জেলা পর্যায়ের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা রয়েছে। ফলে একটি কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামো স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেটের ক্রীড়াঙ্গনের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। ক্রিকেট, ফুটবল, অ্যাথলেটিকসসহ বিভিন্ন খেলায় এ অঞ্চলের খেলোয়াড়রা জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হলে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের উঠে আসার সুযোগও বাড়ে। সে কারণে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল ও কার্যকর থাকা ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নতুন আহ্বায়ক কমিটির সামনে তাই একাধিক প্রত্যাশা রয়েছে। স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকদের মতে, জেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা আয়োজন, খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো এবং বিভিন্ন বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়া গেলে সিলেট থেকে আরও প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসতে পারেন। পাশাপাশি নারী খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং তরুণদের ক্রীড়ামুখী করার উদ্যোগও স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে কমিটি হওয়ায় প্রশাসনিক সমন্বয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে। মাঠ, ক্রীড়া অবকাঠামো, নিরাপত্তা, বিভিন্ন আয়োজনের অনুমোদন কিংবা সরকারি সহযোগিতার মতো বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় ক্রীড়া কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে পুলিশ সুপার ও প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো সমন্বয় করার সুযোগ তৈরি করবে।
কমিটিতে জেলা ক্রীড়া অফিসারের অন্তর্ভুক্তি ক্রীড়া প্রশাসনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে স্থানীয় ক্রীড়াবিদ মকসুদ আহমদের মতো ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতি মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা কমিটির কাজে যুক্ত করতে পারে। খেলোয়াড়দের সমস্যা, প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতার বাস্তব চিত্র সম্পর্কে ক্রীড়াবিদদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে একটি আহ্বায়ক বা অ্যাডহক কমিটির কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে তারা কতটা সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছে তার ওপর। শুধু কমিটি গঠন ও অনুমোদনের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত সভা, ক্রীড়া পরিকল্পনা এবং বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ এবং প্রতিযোগিতার ধারাবাহিকতা তৈরি করা গেলে এর সুফল ভবিষ্যতে পাওয়া যেতে পারে।
সিলেটের অনেক প্রতিভাবান তরুণ খেলাধুলায় আগ্রহী হলেও নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগের অভাবে অনেক সময় তাদের প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় না। একটি শক্তিশালী জেলা ক্রীড়া সংস্থা এই জায়গায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রত্যন্ত উপজেলা ও গ্রামাঞ্চল থেকেও খেলোয়াড় বাছাই করে তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা গেলে জেলার ক্রীড়াঙ্গনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি জেলার ক্রীড়া উন্নয়নের জন্য শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজন যথেষ্ট নয়। খেলোয়াড় তৈরির ধারাবাহিক ব্যবস্থা, দক্ষ প্রশিক্ষক, উপযুক্ত মাঠ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, নিয়মিত প্রতিযোগিতা এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। পাশাপাশি ক্রীড়াবিদদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। এতে পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের খেলাধুলায় যুক্ত করতে আরও উৎসাহিত হতে পারে।
সিলেটের নতুন কমিটির জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে ক্রীড়া অবকাঠামোর যথাযথ ব্যবহার। যেসব মাঠ ও ক্রীড়া স্থাপনা রয়েছে, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়মিত ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে খেলাধুলার পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন অনিয়মিত ব্যবহারে কোনো ক্রীড়া অবকাঠামো নষ্ট হয়ে গেলে তা খেলোয়াড়দের অনুশীলন ও প্রতিযোগিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
স্থানীয় পর্যায়ে ক্রীড়া কার্যক্রম বাড়ানোর আরেকটি বড় সুবিধা হলো তরুণদের সুস্থ ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখা। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রায় শিশু-কিশোরদের মাঠ থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে বিভিন্ন সময় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। নিয়মিত খেলাধুলা তাদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শৃঙ্খলা, দলগত কাজ ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অনুমোদনের ফলে সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সামনে এখন পরিকল্পিতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন কমিটি দায়িত্ব নিয়ে কোন কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেয় এবং কী ধরনের কর্মসূচি হাতে নেয়, সেটিই হবে পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জেলা পর্যায়ের ক্রীড়া সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করা গেলে এর সুফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিভা অন্বেষণ, বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা, নারী ক্রীড়াবিদদের সুযোগ বৃদ্ধি এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেওয়া হলে সিলেটের ক্রীড়াঙ্গন আরও এগিয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী, ক্রীড়া সংগঠক ও সাবেক খেলোয়াড়দের সম্পৃক্ত করে ক্রীড়ার জন্য একটি শক্তিশালী সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলার সুযোগও রয়েছে।
নতুন আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন তাই সিলেটের ক্রীড়াঙ্গনে কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এটি নতুন করে প্রত্যাশা তৈরিরও একটি সুযোগ। মাঠে যারা স্বপ্ন নিয়ে অনুশীলন করেন, জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় নিজেদের প্রমাণ করতে চান কিংবা একদিন জাতীয় দলের জার্সি পরার স্বপ্ন দেখেন, তাদের জন্য কার্যকর ক্রীড়া প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ।
এখন সেই প্রত্যাশা কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, তা নির্ভর করবে নতুন কমিটির উদ্যোগ ও কার্যক্রমের ওপর। সিলেটের ক্রীড়াঙ্গনকে আরও সংগঠিত, প্রতিযোগিতামূলক ও সম্ভাবনাময় করে তুলতে ধারাবাহিক পরিকল্পনা এবং মাঠমুখী কার্যক্রমই হতে পারে নতুন কমিটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে সেই কাজের আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হলো।


