সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে প্রথম দিনে ২৫০ কোটি টাকা ফেরত

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগের পর অবশেষে নিজেদের আমানতের টাকা হাতে পেতে শুরু করেছেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকেরা। সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠিত নতুন এই ব্যাংকে ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রথম দিনেই প্রায় ৬ হাজার গ্রাহক মোট ২৫০ কোটি টাকা পেয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে আটকে থাকা অর্থের একটি অংশ হাতে ফিরে আসায় অনেক গ্রাহকের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।

সোমবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমানত ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দিনে টাকা উত্তোলনকারী গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। তাদের মধ্যে কেউ দীর্ঘদিনের প্রয়োজন মেটাতে টাকা নিয়েছেন, আবার কেউ চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা পারিবারিক জরুরি ব্যয়ের জন্য আটকে থাকা অর্থের অপেক্ষায় ছিলেন। ফলে এই অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি অনেকের কাছে কেবল ব্যাংকিং লেনদেন নয়, বরং দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এর আগে ১ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যক্তি আমানতকারীদের কাছ থেকে টাকা ফেরতের আবেদন গ্রহণ করা হয়। ওই সময়ে মোট ৭৪ হাজার ২২১টি আবেদন জমা পড়ে। এসব আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ফেরত চাওয়া হয়। আবেদন গ্রহণের প্রথম দিনেই ১৮ হাজারের বেশি গ্রাহক প্রায় ১ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন করেছিলেন। পরবর্তী দিনগুলোতেও বিপুলসংখ্যক আমানতকারী তাঁদের অর্থ ফেরতের আবেদন করেন।

আবেদন গ্রহণের সময় গ্রাহকদের মধ্যে যে উদ্বেগ ও আগ্রহ দেখা গিয়েছিল, অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রথম দিনে তার তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক ছিল। রাজধানীর বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকদের উপস্থিতি থাকলেও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা দীর্ঘস্থায়ী জটিলতার খবর পাওয়া যায়নি। অনেক গ্রাহক প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাঁদের অর্থ গ্রহণ করেছেন। ব্যাংক কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রস্তুতি আগে থেকেই নেওয়া হয়েছিল।

অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে ৫ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করা হয়েছে। পরে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে বিভিন্ন শাখায় প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ পাঠানো হয়। এর ফলে আবেদনকারী গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়েছে।

তবে সব গ্রাহক আবেদন করলেও প্রথম দিন সবাই টাকা নিতে ব্যাংকে আসেননি। বিশেষ করে কিছু মেয়াদি আমানতকারী টাকা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। কারণ নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আমানতের পুরো মূল টাকা তুলে নিলে সংশ্লিষ্ট আমানতের মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা এবং আমানত নিরাপদ থাকার বিষয়ে আশ্বাস পাওয়ার পর কেউ কেউ তাঁদের আবেদন প্রত্যাহার করে আমানত চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এতে অর্থ ফেরত নেওয়ার মোট পরিমাণ আবেদন করা অর্থের তুলনায় কিছুটা কম হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবেদুর রহমান সিকদার জানিয়েছেন, আবেদন করা গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে প্রথম দিনে আবেদনকারীদের একটি অংশ ব্যাংকে এসে টাকা নেননি। কেউ কেউ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমানত চালু রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। আবার এমন গ্রাহকও রয়েছেন, যারা টাকা তুলে নেওয়ার পর আবার তা ব্যাংকে জমা দিয়েছেন।

এই পরিস্থিতি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। একদিকে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক তাঁদের দীর্ঘদিন আটকে থাকা অর্থ ফেরত নিতে আগ্রহী, অন্যদিকে ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টায় কিছু গ্রাহক তাঁদের আমানত ধরে রাখার সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন। অর্থাৎ গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ এখনই নেই; তবে অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হওয়াকে আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

একীভূত হওয়ার আগে এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটের মধ্যে ছিল। এসব ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং অনিয়ম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

নতুন ব্যাংকটির যাত্রা কেবল পাঁচটি ব্যাংকের নাম পরিবর্তন বা প্রশাসনিক কাঠামো এক করার বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিপুলসংখ্যক আমানতকারীর অর্থ, কর্মীদের ভবিষ্যৎ, শাখা ও ব্যাংকিং সেবার ধারাবাহিকতা এবং একটি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারী ছিলেন এবং মোট আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।

এ কারণে ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বর্তমান কার্যক্রমকে ব্যাংকটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গ্রাহকেরা তাঁদের অর্থ সময়মতো ও নির্বিঘ্নে ফেরত পেলে ব্যাংকের প্রতি আস্থা তৈরির সুযোগ বাড়বে। বিপরীতে অর্থ ফেরতে দীর্ঘসূত্রতা বা প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিলে আস্থার সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

বিশেষ করে যেসব পরিবার দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সঞ্চয় ব্যবহার করতে পারেনি, তাদের জন্য অর্থ ফেরতের এই কার্যক্রমের গুরুত্ব অনেক বেশি। একজন আমানতকারীর ব্যাংকে রাখা অর্থ অনেক সময় তাঁর সারা জীবনের সঞ্চয়, সন্তানের পড়াশোনার জন্য রাখা অর্থ, চিকিৎসা ব্যয়ের তহবিল কিংবা ব্যবসার মূলধন। তাই ব্যাংকিং ব্যবস্থার কোনো সংকটে অর্থ আটকে গেলে তার প্রভাব শুধু আর্থিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও জড়িয়ে যায়।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সেই বাস্তবতাই এখন সামনে এসেছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রথম দিনে প্রায় ৬ হাজার গ্রাহকের হাতে ২৫০ কোটি টাকা পৌঁছানো তাই একটি প্রতীকী অগ্রগতি। একই সঙ্গে সামনে রয়েছে আরও বড় সংখ্যক আমানতকারীর অর্থ ফেরতের দায়িত্ব।

অর্থ ফেরতের পাশাপাশি ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকটির অনলাইন অর্থ স্থানান্তর কার্যক্রমও চালু হয়েছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর এই সেবা চালু হওয়াকে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার আরেকটি ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ধাপে ধাপে অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম এগিয়ে গেলে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা বাড়বে এবং ব্যাংকটির নিয়মিত কার্যক্রমও আরও গতিশীল হবে। তবে এত বড় একটি আর্থিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, সময়মতো অর্থ পরিশোধ এবং গ্রাহকদের সঙ্গে স্পষ্ট যোগাযোগ—এই তিনটি বিষয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা বলছে, অর্থ ফেরতের দরজা খুলেছে এবং হাজার হাজার গ্রাহক ইতোমধ্যে তাঁদের অর্থ হাতে পেয়েছেন। এখন বড় প্রশ্ন হলো, পরবর্তী দিনগুলোতে একই ধারাবাহিকতা কতটা কার্যকরভাবে বজায় রাখা যায়। কারণ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার এই কর্মসূচি শুধু একটি ব্যাংকিং কার্যক্রম নয়; এটি দীর্ঘদিনের সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত লাখো মানুষের আস্থা পুনর্গঠনেরও পরীক্ষা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

হেফাজতের তত্ত্বাবধানে একসঙ্গে কাজ করবে ৭ ইসলামী দল

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সৌদির কারাগারে সাড়ে ৭ হাজার বাংলাদেশি, রায়ের অপেক্ষায় ঢাকা

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

পূজার ছুটিতে সিলেটে পর্যটকের ঢল, আবাসন সংকট

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

‘হুমকি দিয়ে দমিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখো না’: রুমি

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগে হোটেল সিলগালা

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

হেফাজতের তত্ত্বাবধানে একসঙ্গে কাজ করবে ৭ ইসলামী দল

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সৌদির কারাগারে সাড়ে ৭ হাজার বাংলাদেশি, রায়ের অপেক্ষায় ঢাকা

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

পূজার ছুটিতে সিলেটে পর্যটকের ঢল, আবাসন সংকট

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

‘হুমকি দিয়ে দমিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখো না’: রুমি

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগে হোটেল সিলগালা

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৯ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৮৮

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

খুলনায় মায়ের সামনে গৃহবধূকে গুলি করে হত্যা

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাবিপ্রবিতে ২৩ শিক্ষক নিয়োগ, আবেদন শুরু অনলাইনে

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ