প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
নিরাপত্তার চাদরে মোড়ানো আবাসিক এলাকা, অথচ নিজ ঘরেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন এক বৃদ্ধ ব্যবসায়ী দম্পতি ও তাঁদের এক গৃহকর্মী। সিলেট নগরীর প্রাণকেন্দ্র রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের পর পুরো এলাকজুড়ে চরম আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। চার সন্তান প্রবাসে জীবন কাটাচ্ছেন, আর দেশের এই ডেস্কে বসে থাকা বৃদ্ধ বাবা-মাকে ঘিরে যাদের পুরো পৃথিবী আবর্তিত হওয়ার কথা, সেই শূন্যতা আর নিস্তব্ধতার সুযোগেই ঘটে গেছে এই নৃশংস ঘটনা। এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ কী এবং এর পেছনে কারা জড়িত, তা উদঘাটনে এখন মাঠে নেমেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একাধিক বিশেষ টিম।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বুধবার সকালে। রায়নগর আবাসিক এলাকার মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করে আসছিলেন এলাকার পরিচিত মুখ, ব্যবসায়ী ও চেম্বার অব কমার্সের সম্মানিত সদস্য আব্দুস সাত্তার (৯০) এবং তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬)। তাঁদের সাথে বাড়িতে রান্নাবান্না ও দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন তরুণী গৃহকর্মী তাহমিনা (২৫)। এই দম্পতির চার সন্তানের কেউই দেশেই থাকেন না। তাঁদের মধ্যে দুজন যুক্তরাজ্য এবং অপর দুজন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ফলে বিলাসবহুল ওই বাসটিতে এই বৃদ্ধ দম্পতি আর গৃহকর্মী ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সকাল গড়িয়ে গেলেও বাসাটির দরজা বাইরে থেকে বন্ধ দেখে প্রতিবেশীদের সন্দেহ জাগে। একপর্যায়ে দরজার নিচ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে দেখে তাদের বুক কেঁপে ওঠে। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁরা জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে পুরো বিষয়টি অবহিত করেন।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। পুলিশ বাসার দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখতে পায় এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী দৃশ্য। ঘরের মেঝেতে পড়ে রয়েছে আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনার রক্তাক্ত মরদেহ। তিনজনকে অত্যন্ত ক্ষুরধার অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। তবে হত্যাকারীরা ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় ঘটনাস্থলে কোনো অস্ত্র ফেলে যায়নি, ফলে অস্ত্র উদ্ধারেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে এলাকার শত শত মানুষ ওই বাড়ির সামনে ভিড় জমান। এত প্রবীণ এবং নিরুপায় মানুষদের ওপর এমন নৃশংস আক্রমণ কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা।
কেন এবং কী উদ্দেশ্যে এই তিনজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, তা নিয়ে জনমনে চলছে নানা গুঞ্জন ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। নিহত দম্পতির ভাগনে মুন্না মিয়া গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনার দিন সকালেও তাঁর মামি সুরাইয়া বেগমের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়েছিল। তিনি ধারণা করছেন, সকাল নয়টার ঠিক পরপরই এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। স্বজনদের ভাষ্যমতে, মামির আমেরিকার ভিসার কাগজ প্রস্তুত থাকলেও মামা আব্দুস সাত্তার দেশ ছেড়ে বিদেশে যেতে রাজি হননি, যে কারণে তারা ভারতেই বা দেশেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন। আত্মীয়-স্বজনদের দাবি, আব্দুস সাত্তারের দীর্ঘ ব্যবসায়িক জীবনে কখনো কারো সঙ্গে বড় ধরনের কোনো শত্রুতা ছিল না। হাউজিং ব্যবসা থেকে শুরু করে আইপিএস ও অন্যান্য বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। নব্বই বছর বয়সী একজন প্রবীণ মানুষকে কেন এভাবে প্রাণ হারাতে হলো, তা নিয়ে আজ প্রশ্ন তুলেছেন স্বজনেরা। বৃদ্ধ বয়সেই যদি ঘরের ভেতর নিরাপদে থাকা না যায়, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে—সেই প্রশ্নও এখন সর্বত্র প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশ কমিশনার গণমাধ্যমকে জানান, প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে রাখা হচ্ছে। প্রথমত, বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রপ খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে এবং সোনাদানা ও দামি জিনিসপত্র খোয়া গেছে বলে তথ্য মিলেছে। এটি কোনো পরিকল্পিত ডাকাতি বা চুরির ঘটনা কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে পূর্বের কোনো পারিবারিক বিরোধ বা শত্রুতা ছিল কি না, তাও গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। তৃতীয়ত, সম্পত্তির বিরোধের দিকটিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। স্থানীয় শিবগঞ্জ এলাকার বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে গণমাধ্যমকে জানান, পরিবারের কাছ থেকে তারা জানতে পেরেছেন মদনমোহন কলেজের সামনে এই পরিবারের একটি সম্পত্তি রয়েছে এবং তা নিয়ে কিছুটা বিরোধ চলে আসছে। এই বিষয়টিকেও পুলিশ যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়েছে।
পুলিশ কমিশনার আরও জানান, পিবিআই এবং সিআইডির ক্রাইমসিন টিম ইতোমধ্যে আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া ঘটনার ক্লু উদঘাটনে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। ভাড়াটিয়াদের জবানবন্দি অনুযায়ী সকালে কিছু চিৎকার-চেঁচামেচি শোনা গিয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলও উদ্ধার করা হয়েছে, যা তদন্তের গতিপথ নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও তৎপরতা শুরু করেছে।
চারটি সন্তান সুদূর প্রবাসে বসে বাবা-মায়ের মৃত্যুর এই হৃদয়বিদারক সংবাদ শোনার পর থেকে শোকে পাথর হয়ে গেছেন। সন্তানহীন নিঃসঙ্গ মুহূর্তে বাবা-মাকে শেষবারের মতো দেখার আকুতি এখন তাদের কণ্ঠে। সিলেট নগরীর এই প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী আবাসিক এলাকার এমন একটি সুরক্ষিত বাড়িতে এমন লোমহর্ষক ট্র্যাজেডি নজিরবিহীন। এলাকার মুরব্বি হিসেবে পরিচিত আব্দুস সাত্তারের এমন পৈশাচিক পরিণতি পুরো শহরবাসীকে নাড়া দিয়েছে। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পুলিশও আশ্বাস দিয়েছে যে, খুব শীঘ্রই সব রহস্য উন্মোচন করে আইনের আওতায় আনা হবে খুনিদের। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, কবে এই অন্ধ অধ্যায়ের যবনিকা পতন ঘটে এবং বেরিয়ে আসে আসল সত্য।


