সিলেটে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের মৃত্যু, বিচারের অপেক্ষা

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেও বাংলাদেশের সঙ্গে, বিশেষ করে সিলেটের সঙ্গে, ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের সম্পর্ক বহু প্রজন্মের। শেকড়ের টানে অনেকে প্রতিবছর দেশে ফেরেন। কেউ আসেন পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাতে, কেউ সম্পত্তি ও পারিবারিক বিষয় দেখভাল করতে, আবার কেউ দীর্ঘদিন পর জন্মভূমির পরিচিত মানুষ ও পরিবেশের কাছে ফিরতে চান। কিন্তু এই ফেরার গল্প সবার জন্য সুখের হয়নি। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে ফিরে এসে একাধিক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, আবার কয়েকটি মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্যও।

সিলেটকে ঘিরে থাকা এসব ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত এবং কোনো মৃত্যুর ঘটনা প্রশ্ন তৈরি করলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার কতটা দ্রুত হয়। বিভিন্ন সময়ের সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের মৃত্যু ও হত্যাকাণ্ডের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এর বড় একটি অংশের সঙ্গে সিলেট বিভাগের জেলা ও প্রবাসী পরিবারগুলোর সরাসরি যোগ রয়েছে।

১৯৯৬ সালের ৯ মে ঢাকার বিমানবন্দরে নিউক্যাসলের রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী সৈয়দ সিরাজ ওরফে সুরত মিয়া হত্যার ঘটনা দিয়ে আলোচিত এই ধারার একটি পুরোনো অধ্যায় শুরু হয়। ৩৫ বছর বয়সী সুরত মিয়া বাংলাদেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে তাঁর সঙ্গে থাকা অর্থ নিয়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনায় কয়েকজন কাস্টমস কর্মকর্তাকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে প্রমাণের ঘাটতির কথা উল্লেখ করে তাঁদের অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এর কয়েক বছর পর ২০০১ সালে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণ মুঘল কুরাইশির মৃত্যু আরেকটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। ২২ বছর বয়সী এই তরুণ বাংলাদেশে বেড়াতে এসে সিলেট থেকে ঢাকায় যান। এরপর তিনি যে হোটেলে থাকার কথা ছিল, সেখান থেকে নিখোঁজ হন। দুই দিন পর ঢাকার বিমানবন্দর এলাকার কাছাকাছি তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সে সময় পুলিশের তদন্তে পাসপোর্ট ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে উঠে আসে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনার বিচার নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

২০০৩ সালে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে লন্ডনপ্রবাসী দুলা মিয়া নিহত হন। দীর্ঘ সময় পর ২০২২ সালে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি আসে। তবে তিন দশকের কাছাকাছি সময় ধরে চলা ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়, প্রবাসী পরিবারগুলোর জন্য বিচার পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘ অপেক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০১১ সালের ২৬ জুন সিলেটের বিশ্বনাথে বাংলাদেশে বেড়াতে এসে নিহত হন রচডেলের বাসিন্দা হাজি তাহির আলী। মুখোশধারীদের হামলায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে সে সময়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল। জমিসংক্রান্ত বিরোধকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সামনে আনা হলেও দীর্ঘ সময় পরও এ ঘটনার বিচার সম্পন্ন হয়নি বলে বর্তমান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৩ সালে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের পাটলি গ্রামে ঘটে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। যুক্তরাজ্যের স্টেপনি গ্রিনের বাসিন্দা রেহানা বেগম স্বামী ও সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে দেশে এসেছিলেন। ২ আগস্ট তিনি হত্যার শিকার হন। পরিবারের সদস্যদের সামনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় স্বজনদের একটি অংশের বিরুদ্ধে অর্থ ও স্বর্ণের জন্য হত্যার অভিযোগের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। তবে এ ঘটনার বিচারও দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ব্রিটিশ নাগরিক জালাল উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনাও আলোচনায় আসে। সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকার কথা উল্লেখ করে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করে। তবে এই ঘটনার বিচারিক নিষ্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।

এরপর ২০২২ সালের ওসমানীনগরের ঘটনা সিলেটের প্রবাসী সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী রফিকুল ইসলাম তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে চিকিৎসার জন্য দেশে এসেছিলেন। পরে তাঁরা ওসমানীনগরের তাজপুর এলাকার একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। সেখানে পরিবারের পাঁচ সদস্যকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর রফিকুল ইসলাম ও তাঁর ছেলে মাইকুল ইসলাম মারা যান। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরিবারের আরও সদস্যের মৃত্যু হয়।

ঘটনাটি শুরু থেকেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে সে সময় বিষক্রিয়া কিংবা বন্ধ কক্ষে জেনারেটর চালানোর কারণে কার্বন মনোক্সাইডের প্রভাবে অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। তবে পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর ঘটনাটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা আলোচনা চলতে থাকে। ফলে ওসমানীনগরের এই ঘটনা সিলেটে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের রহস্যজনক মৃত্যুর আলোচিত উদাহরণ হয়ে আছে।

২০২৩ সালে সিলেটের বিয়ানীবাজারে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী জালাল উদ্দিনের মৃত্যু নিয়েও গুরুতর অভিযোগ ওঠে। জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে স্বজনদের মারধরে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। প্রথমে ঘটনাটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে দেখিয়ে দাফন করা হলেও পরে যুক্তরাজ্যে থাকা পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেন। মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের পর আঘাতজনিত মৃত্যুর বিষয়টি সামনে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রবাসী পরিবারের সন্দেহ আরও গভীর হয় এবং তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর তাদের নির্ভরতা বাড়ে।

২০২৪ সালের ৭ মার্চ দক্ষিণ সুরমার মোগলাবাজার থানার রুস্তমপুর এলাকায় যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আব্দুল কাইয়ূম নিহত হন। জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর স্ত্রী বাদী হয়ে মামলা করলেও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে হতাশা প্রকাশের কথা জানা যায়।

সবশেষ ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বোরহান উদ্দিন শফির ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এই ব্যক্তি সিলেট থেকে কুলাউড়ার উদ্দেশে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন। কয়েক দিন পর জকিগঞ্জের একটি হাওর থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ পরে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করে এবং একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘটনার পেছনে সম্পত্তি, পারিবারিক বিরোধ, অর্থ বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের মতো বিষয় অভিযোগ বা তদন্তের অংশ হিসেবে সামনে এসেছে। তবে প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের। তাই অভিযোগ, প্রাথমিক তদন্ত এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত—এই তিনটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

সিলেট ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের গভীরতার কারণেই এসব ঘটনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক সিলেট সফরের সময় বলেন, যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের প্রায় ৯০ শতাংশের শিকড় সিলেটে। তিনি বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথাও তুলে ধরেন।

প্রবাসীদের কাছে সিলেট শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি তাঁদের শেকড়, পরিবার ও স্মৃতির জায়গা। সেই টানেই প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ বিদেশ থেকে দেশে ফেরেন। কিন্তু দেশে ফিরে কোনো প্রবাসী যদি হত্যার শিকার হন কিংবা তাঁর মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রবাসী সমাজের মধ্যেও নিরাপত্তা, সম্পত্তি ও ন্যায়বিচার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

এ কারণে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে পুরোনো যেসব মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি, সেগুলোর অগ্রগতিও স্বজন ও প্রবাসী সমাজের কাছে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কারণ প্রবাসীরা যখন মাটির টানে দেশে ফেরেন, তখন তাঁদের প্রত্যাশা থাকে আপনজন ও শেকড়ের কাছে নিরাপদে থাকার। সেই নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেওয়াই হওয়া উচিত রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচারব্যবস্থার অন্যতম দায়িত্ব।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

১২ অক্টোবর ইউপি নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করবে ইসি

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাংলাদেশে স্টারলিংক মোবাইল, উচ্ছ্বসিত ইলন মাস্ক

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে দ্বিতীয় স্থান হারাল বাংলাদেশ

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে ভারতের সঙ্গে সংলাপ চায় বাংলাদেশ

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নাটোর স্টেশনে জার্মান পর্যটকের ব্যাগ চুরি

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

১২ অক্টোবর ইউপি নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করবে ইসি

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাংলাদেশে স্টারলিংক মোবাইল, উচ্ছ্বসিত ইলন মাস্ক

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে দ্বিতীয় স্থান হারাল বাংলাদেশ

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে ভারতের সঙ্গে সংলাপ চায় বাংলাদেশ

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নাটোর স্টেশনে জার্মান পর্যটকের ব্যাগ চুরি

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের খরচ বেড়েছে

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হামের উপসর্গে আরও দুই শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সৌদি থেকে ফিরল কানাইঘাটের দুই প্রবাসীর মরদেহ

প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ