প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে দেশে টাকা পাঠানো প্রবাসীদের জন্য রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ আবারও বেড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে বাংলাদেশে প্রতি ১ হাজার ডলার রেমিট্যান্স পাঠাতে গড়ে ১৮ দশমিক ২০ ডলার খরচ হয়েছে। এর আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে একই পরিমাণ অর্থ পাঠাতে গড়ে খরচ হয়েছিল ১৭ দশমিক ৮০ ডলার। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে প্রতি ১ হাজার ডলারে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যয় বেড়েছে ৪০ সেন্ট।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর গড় খরচ ছিল ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে তা বেড়ে হয়েছে ১ দশমিক ৮২ শতাংশ। শতাংশের হিসাবে বৃদ্ধির পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও বিপুলসংখ্যক প্রবাসী নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠানোর কারণে সামগ্রিকভাবে এই অতিরিক্ত ব্যয় তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদেশি ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর সেবার খরচ বৃদ্ধি, বিভিন্ন ধরনের ফি ও কর আরোপ এবং বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামা রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ। অর্থাৎ শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ফি নয়, আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজার ও আর্থিক সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক বিষয় রেমিট্যান্সের খরচে প্রভাব ফেলছে।
রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে তুলনামূলক ছোট অঙ্কের অর্থ পাঠানো প্রবাসীদের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০ ডলার পর্যন্ত রেমিট্যান্স পাঠাতে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে গড় খরচ ছিল ২ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৯৪ শতাংশে।
অন্যদিকে, ২০০ থেকে ৫০০ ডলার রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে গড় খরচ কিছুটা কমেছে। জানুয়ারি-মার্চে এই পরিমাণ অর্থ পাঠাতে গড় খরচ ছিল শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ। এপ্রিল-জুনে তা কমে হয়েছে শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ। ৫০০ ডলারের বেশি অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যয় সামান্য বেড়ে শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হয়েছে।
এতে স্পষ্ট হয়, বড় অঙ্কের অর্থ পাঠানো প্রবাসীদের তুলনায় ছোট অঙ্কের রেমিট্যান্স পাঠানো প্রবাসীদের ক্ষেত্রে খরচের হার তুলনামূলক বেশি। অথচ বিদেশে কর্মরত অনেক বাংলাদেশি নিয়মিতভাবে ছোট ছোট অঙ্কে পরিবারের জন্য অর্থ পাঠান। মাসিক আয় থেকে পরিবারের খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাড়িভাড়া বা অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে তারা একাধিকবার অর্থ পাঠাতে পারেন। ফলে প্রতিবার রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ তাদের পরিবারের হাতে পৌঁছানো অর্থের পরিমাণে প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবাসী অধ্যুষিত দেশ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বেড়েছে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কাতার, ইতালি, ওমান ও যুক্তরাজ্য রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর গড় খরচ জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ছিল ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এপ্রিল-জুনে তা বেড়ে হয়েছে ২ দশমিক ৯২ শতাংশ। মালয়েশিয়া থেকে একই সময়ে খরচ ১ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১ দশমিক ১২ শতাংশ।
কাতার থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর গড় খরচ ১ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১ দশমিক ২৮ শতাংশ। ইতালি থেকে বেড়েছে ১ দশমিক ১৪ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ২৭ শতাংশে। ওমান থেকে খরচ সামান্য বেড়ে ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে হয়েছে ১ দশমিক ৪০ শতাংশ। যুক্তরাজ্য থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যয়ও বেড়েছে। জানুয়ারি-মার্চে যেখানে গড় খরচ ছিল ১ দশমিক ১৮ শতাংশ, এপ্রিল-জুনে তা দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৪৬ শতাংশে।
তবে সব দেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বাড়েনি। কয়েকটি দেশ থেকে বরং ব্যয় কমেছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুর।
সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর গড় খরচ ২ দশমিক ৫২ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ২ দশমিক ২৭ শতাংশ। কুয়েত থেকে খরচ ১ দশমিক ৬১ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ১ দশমিক ৫১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যয় ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১১ শতাংশে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে ব্যয় কমেছে সিঙ্গাপুর থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে। জানুয়ারি-মার্চে দেশটি থেকে দেশে টাকা পাঠাতে গড়ে খরচ হতো ১ দশমিক ৩১ শতাংশ। এপ্রিল-জুনে তা কমে হয়েছে শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ।
দেশভেদে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচের এই পার্থক্য প্রবাসীদের জন্য বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর খরচ ক্রমাগত বাড়তে থাকলে প্রবাসীদের একটি অংশ তুলনামূলক কম খরচের অবৈধ বা অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানোর দিকে ঝুঁকতে পারেন। এর ফলে বৈধ পথে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রার উৎস। তাই প্রবাসীরা যাতে সহজ, নিরাপদ ও কম খরচে দেশে অর্থ পাঠাতে পারেন, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব দেশ থেকে নিয়মিত বড় অঙ্কের প্রবাসী আয় আসে, সেসব দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যয় কমাতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।
প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংককে যেসব দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ তুলনামূলক বেশি, সেসব দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে আলোচনা করে খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ কমানো গেলে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের আগ্রহ আরও বাড়তে পারে।
দেশের ভেতরে রেমিট্যান্স বিতরণের ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বিদেশ থেকে দেশে অর্থ আসার পর প্রবাসীদের স্বজনদের কাছে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই অর্থ পৌঁছে দিতে যে খরচ হয়, তা কমানোর উদ্যোগের ফলে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে রেমিট্যান্স বিতরণের ব্যয় কিছুটা কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থ পাঠানোর ব্যয় কমানোর বিষয়টি এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। কারণ প্রবাসী আয় দেশে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এক্সচেঞ্জ হাউজ, মুদ্রা রূপান্তর এবং বিভিন্ন ধরনের ফি যুক্ত থাকে। এর যেকোনো একটি পর্যায়ে ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়তে পারে প্রবাসী এবং দেশে থাকা তার পরিবারের ওপর।
প্রবাসে থাকা বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ পরিবারের নিয়মিত খরচ মেটাতে দেশে অর্থ পাঠান। তাদের পাঠানো অর্থ দিয়ে অনেক পরিবার সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, আবাসন, কৃষি বা ছোট ব্যবসার ব্যয় নির্বাহ করে। ফলে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ সামান্য বাড়লেও দীর্ঘ সময়ে তা পরিবারের মোট প্রাপ্ত অর্থের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রবাসী আয় ধরে রাখতে শুধু দেশে রেমিট্যান্স গ্রহণের ব্যবস্থা সহজ করাই যথেষ্ট নয়; বিদেশ থেকে বাংলাদেশে অর্থ পাঠানোর খরচও সহনীয় পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন। নিরাপদ ও বৈধ চ্যানেলে দ্রুত অর্থ পাঠানোর সুযোগ তৈরি হলে প্রবাসীদের আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি দেশের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় রেমিট্যান্স প্রবাহও শক্তিশালী থাকবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান দীর্ঘদিনের। পরিবারের জন্য পাঠানো প্রতিটি অর্থের পেছনে থাকে একজন প্রবাসীর শ্রম ও ত্যাগ। সেই অর্থ দেশে পৌঁছানোর পথে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় যত কমানো যাবে, তত বেশি অর্থ সরাসরি পৌঁছাবে প্রবাসীদের পরিবারগুলোর হাতে। তাই রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যয় কমানোকে শুধু আর্থিক লেনদেনের বিষয় হিসেবে নয়, প্রবাসী পরিবার ও দেশের বৈধ বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের স্বার্থেও গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।


