প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানায় একের পর এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘিরে ঘুষসংক্রান্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এবার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) অতনু বণিককে থানা থেকে প্রত্যাহার করে হবিগঞ্জ পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) তাঁর বিরুদ্ধে মামলা-সংক্রান্ত বিষয়ে এক ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগসংবলিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সেখানে এএসআই অতনু বণিককে এক ব্যক্তির সঙ্গে মামলা-সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে এবং একপর্যায়ে তাঁর কাছ থেকে টাকা নিতে দেখা যায়। কয়েকটি প্রতিবেদনে অর্থের পরিমাণ ১০ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ভিডিওটি কখন ধারণ করা হয়েছিল, পুরো কথোপকথনের প্রেক্ষাপট কী ছিল এবং লেনদেনটি কী উদ্দেশ্যে হয়েছিল—এসব বিষয় স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম উল্লেখ করেছে।
অভিযোগের বিষয়ে এএসআই অতনু বণিকের বক্তব্য জানতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও অভিযোগের বিষয়ে তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
চুনারুঘাট থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভিডিওটি নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাই বলা হয়েছে।
পুলিশের এই প্রশাসনিক পদক্ষেপের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মঙ্গলবার সকালে ভিডিওটি প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তা বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্থানীয়ভাবে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। পরে বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনের নজরে এলে বিকেলে অতনু বণিককে চুনারুঘাট থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়।
ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একই থানার আরেক এএসআইকে ঘিরে ঘুষসংক্রান্ত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার এক দিনের মধ্যেই অতনু বণিকের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ সামনে এসেছে। এর আগে এএসআই ইলিয়াস হোসেনকে ঘিরে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি প্রকাশের পর তাঁকেও চুনারুঘাট থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয় এবং বিষয়টি তদন্তের জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।
একই থানার দুই এএসআইকে পরপর ঘুষসংক্রান্ত ভিডিওকে কেন্দ্র করে প্রত্যাহার করার ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদারকি, জবাবদিহি ও পেশাগত শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের একাংশ বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো ভিডিওকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার আগে এর উৎস, সময়, সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে অতনু বণিকের বিরুদ্ধে আগেও দায়িত্ব পালনের সময় ক্ষমতার অপব্যবহার বা অসদাচরণের অভিযোগ ওঠার কথা স্থানীয়দের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মামলার তদন্তে গিয়ে এক নারীকে শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। তবে এসব পুরোনো অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করার মতো তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি। তাই এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে নয়, অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাটির ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের ফলে তদন্তের জন্য অতনু বণিককে থানার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা; এটি নিজেই অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা বা কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। অভিযোগের প্রকৃত চিত্র তদন্তের পরই স্পষ্ট হওয়ার কথা।
পুলিশের দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সাধারণ মানুষের অভিযোগ গ্রহণ, আইনগত প্রক্রিয়ায় সহায়তা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে সেটি শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আচরণের প্রশ্ন নয়; পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির সঙ্গেও বিষয়টি জড়িত। এ কারণেই অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
চুনারুঘাটের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকার বিষয়টিও সামনে এনেছে। কোনো ঘটনার ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তা মুহূর্তেই ব্যাপক মানুষের নজরে আসে এবং প্রশাসনের কাছেও বিষয়টি দ্রুত পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে অসম্পূর্ণ ভিডিও বা প্রেক্ষাপটবিহীন দৃশ্য থেকে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তাই তদন্তের ক্ষেত্রে ভিডিওর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, নথিপত্র, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করা জরুরি।
এএসআই অতনু বণিকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে এখন বিভাগীয় তদন্তের দিকে নজর রয়েছে। চুনারুঘাট থানার ওসি জানিয়েছেন, তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
একই সময়ে একই থানার দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে ঘুষসংক্রান্ত অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় বিষয়টি স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে যাচাই করা হলে একদিকে নির্দোষ কর্মকর্তারা নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে অভিযোগ সত্য হলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথও পরিষ্কার হবে।
বর্তমানে অতনু বণিক পুলিশ লাইনে সংযুক্ত রয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তাধীন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট, অর্থ লেনদেনের উদ্দেশ্য এবং অভিযোগের অন্যান্য দিক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়ার কথা। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
চুনারুঘাট থানায় পরপর দুই এএসআইকে ঘিরে এমন অভিযোগ সামনে আসার পর স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়গুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত হবে এবং অভিযোগের সত্যতা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের পক্ষ থেকেও তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এখন সেই তদন্তের ফলাফল এবং পরবর্তী বিভাগীয় সিদ্ধান্তের দিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।


