প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হাম ও হাম সন্দেহে প্রাণহানি থামছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের শুরু থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত সিলেট বিভাগে হাম ও হাম সন্দেহে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৫ জনে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, মৃতদের মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছিল ১০ জনের। বাকি ১৭৫ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায়।
স্বাস্থ্য বিভাগের ৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে সর্বশেষ দুই মৃত্যুর তথ্য উঠে এসেছে। মারা যাওয়া দুই শিশুর একজন সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার এবং অন্যজন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বাসিন্দা। দুজনের বয়সই এক বছরের কম। এত অল্প বয়সে দুই শিশুর মৃত্যু নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে সংশ্লিষ্ট পরিবার ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে।
গোয়াইনঘাটের শিশুটির বয়স ছিল মাত্র ৯ মাস। ৭ অক্টোবর সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ৬ মাস বয়সী আরেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে ৬ অক্টোবর। সে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল।
দুই শিশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সিলেট বিভাগে হাম ও হাম সন্দেহে মৃত্যুর যে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে, তার বড় অংশই এখনো পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, বিভাগে সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে ১৭৫ জনের। পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর প্রায় পুরো অংশই হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন থাকা রোগীদের মধ্যে ঘটেছে।
জেলাভিত্তিক হিসাবেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সিলেট জেলায় হাম ও হাম সন্দেহে মোট ৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে সন্দেহজনক হাম রোগে এবং চারজনের মৃত্যু পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত কারণে। সুনামগঞ্জে মোট মৃত্যু হয়েছে ৬৭ জনের। তাদের মধ্যে ৬৬ জনের মৃত্যু সন্দেহজনক হাম রোগে এবং একজনের মৃত্যু নিশ্চিত হামজনিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া হবিগঞ্জে হাম ও হাম সন্দেহে ২৮ জন এবং মৌলভীবাজারে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। চার জেলার তথ্য মিলিয়ে বিভাগের মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১৮৫ জনে পৌঁছেছে।
শুধু মৃত্যুই নয়, হাসপাতালগুলোতে নতুন রোগীর চাপও অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম সন্দেহে নতুন করে ২২৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮৮ জন ভর্তি হয়েছেন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৬৬ জন এবং এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৬ জন।
এ ছাড়া পার্কভিউ মেডিকেল হাসপাতালে ১২ জন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে সাতজন, জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচজন, রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল হাসপাতালে চারজন এবং ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে এখনো বিপুলসংখ্যক শিশু ও রোগী হাম সন্দেহে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম সন্দেহে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ৫৫২ জন।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি আছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২০৩ জন। শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৭০ জন এবং সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৭৭ জন চিকিৎসাধীন আছেন।
পার্কভিউ মেডিকেল হাসপাতালে ২৮ জন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ২৭ জন এবং রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল হাসপাতালে ১০ জন হাম সন্দেহে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আটজন, গোলাপগঞ্জে সাতজন, বিশ্বনাথে পাঁচজন এবং কোম্পানীগঞ্জে চারজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ ছাড়া নর্থ ইস্ট হাসপাতালে তিনজন, উইমেন্স মেডিকেল হাসপাতালে তিনজন, হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে তিনজন, ফেঞ্চুগঞ্জে দুজন এবং ধর্মপাশায় দুজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
রোগীর এই চাপ সিলেট বিভাগের হাসপাতালগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে শিশু রোগীদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ ও সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দ্রুত কমছে না।
স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত সিলেট বিভাগে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৯৫ জন। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৪২২ জন, সুনামগঞ্জে ৩৫৭ জন, হবিগঞ্জে ১৫৮ জন এবং মৌলভীবাজারে ১৫৮ জন রয়েছেন। হবিগঞ্জের শনাক্ত রোগীর সংখ্যার মধ্যে দুজন রুবেলা রোগীও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
এই পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, শুধু মৃত্যুর সংখ্যাই নয়, হাম শনাক্ত হওয়ার ঘটনাও সিলেট বিভাগে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় রয়েছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক রোগী উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এত মানুষের মৃত্যু স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে মারা যাওয়া দুই শিশুর বয়স এক বছরের কম হওয়ায় শিশুদের ঝুঁকির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একটি পরিবারে শিশুর অসুস্থতা যেমন স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে থামিয়ে দেয়, তেমনি শিশুকে হারানোর ঘটনা পরিবারকে দীর্ঘস্থায়ী শোকের মধ্যে ঠেলে দেয়। সিলেট ও সুনামগঞ্জের সর্বশেষ দুই পরিবারও এখন সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৫৫২ রোগীর তথ্যও পরিস্থিতির ব্যাপ্তি বোঝায়। প্রতিদিন নতুন করে শত শত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর সংখ্যার বড় অংশই এখনো ‘সন্দেহজনক হাম’ হিসেবে নথিভুক্ত। এর অর্থ হলো, উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা রোগীদের মধ্যেই অধিকাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যদিও তাদের সবার ক্ষেত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়নি। তাই হাম ও হাম সন্দেহে মৃত্যুর পরিসংখ্যান আলাদাভাবে বোঝা জরুরি।
একই সঙ্গে পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগীর সংখ্যাও কম নয়। বছরের প্রথম দিন থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ৯৫ জনের পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে। ফলে বিভাগজুড়ে রোগের বিস্তার এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ—দুই বিষয়ই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
সিলেট বিভাগের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে শিশুদের আক্রান্ত হওয়া এবং অল্প বয়সে প্রাণহানি। গোয়াইনঘাটের ৯ মাস বয়সী শিশু এবং দিরাইয়ের ৬ মাস বয়সী শিশুর মৃত্যু সেই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে। দুই পরিবারের জন্য এটি যেমন অপূরণীয় ক্ষতি, তেমনি বৃহত্তরভাবে শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার গুরুত্বও সামনে এনেছে।
হাম ও হাম সন্দেহে মৃত্যুর সংখ্যা ১৮৫-এ পৌঁছানো এবং একই সময়ে শত শত রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য পর্যবেক্ষণ, রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে নতুন রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশের মাধ্যমে পরিস্থিতি সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেট বিভাগের হাসপাতালগুলোতে এখনো ৫৫২ জন রোগী চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে অনেকেই শিশু। তাদের দ্রুত সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে পরিবারগুলো। আর যারা ইতোমধ্যে স্বজনকে হারিয়েছেন, তাদের শোকের ভার আরও গভীর হয়েছে সর্বশেষ দুই শিশুর মৃত্যুর খবরে। স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান তাই শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি শিশুর জীবন এবং একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির গল্প।


