প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার দুই প্রবাসী বাংলাদেশি আব্দুল করিম ও খালিদ আহমদের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেটের এম এ জি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মরদেহ দুটি পৌঁছালে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে পরিবারের স্বচ্ছলতার জন্য কাজ করা দুই ব্যক্তির মরদেহ দেশে ফেরার খবরে কানাইঘাটের লামার তালুক গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
মরদেহ দেশে আনার পর দাফন সম্পন্ন করার জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিহতদের প্রত্যেক পরিবারের হাতে ৩৫ হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। সরকারের এই সহায়তার জন্য নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়রা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
নিহত আব্দুল করিম ও খালিদ আহমদ কানাইঘাট উপজেলার ৭ নম্বর দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের লামার তালুক গ্রামের বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে তারা সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন। প্রবাসজীবনে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানোর চেষ্টা করছিলেন তারা। দেশে ফেরার প্রস্তুতির মধ্যেই সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু পরিবারের জন্য যেমন আকস্মিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে, তেমনি পুরো এলাকায় তৈরি করেছে গভীর শোক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিয়ে তারা জেদ্দা বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগেই তায়েফের আল-খুরমা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন তারা। ওই দুর্ঘটনায় চারজন প্রবাসী নিহত হন বলে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে আব্দুল করিম ও খালিদ আহমদ ছিলেন সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বাসিন্দা।
দেশে ফেরার যে যাত্রা তাদের পরিবারের সঙ্গে নতুন করে দেখা হওয়ার কথা ছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় শেষ বিদায়ের যাত্রায়। প্রবাসে থাকা স্বজনের দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা দুটি পরিবারকে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে মরদেহ ফিরে আসার জন্য। এমন ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে শোক ও বেদনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে।
৭ নম্বর দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লোকমান উদ্দিন বলেন, নিহত আব্দুল করিম ও খালিদ আহমদ দুজনই তাঁর ইউনিয়নের বাসিন্দা। পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য তারা দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলেন। দেশে ফেরার প্রস্তুতির সময় এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর তিনি নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় পুরো ইউনিয়নের মানুষ শোকাহত। নিহতদের পরিবারের জন্য সরকার এরই মধ্যে সহযোগিতা করেছে উল্লেখ করে তিনি ভবিষ্যতেও নির্ধারিত সরকারি অনুদান দেওয়ার আহ্বান জানান। বৃহস্পতিবার বিকেলে নিহত দুই প্রবাসীর জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরে নিজ এলাকায় তাদের দাফন সম্পন্ন করা হবে।
নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়দের ভাষ্য, পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় বহু মানুষকে প্রবাসে পাড়ি জমাতে হয়। আব্দুল করিম ও খালিদ আহমদও সেই বাস্তবতার অংশ হিসেবে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় পরিবার ও আপনজনদের কাছ থেকে দূরে থেকে কাজ করার পর দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেই ফেরার আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের জীবন থেমে যায়।
স্বজনদের কাছে প্রবাসে থাকা মানুষ শুধু পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য নন; তাদের ঘিরে থাকে পরিবারের নানা স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। তাই বিদেশের মাটিতে কোনো প্রবাসীর মৃত্যুর খবর একটি পরিবারের জন্য কেবল একজন মানুষকে হারানোর ঘটনা নয়, অনেক সময় পুরো পরিবারের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন ডেকে আনে। আব্দুল করিম ও খালিদ আহমদের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতাই এখন সামনে এসেছে।
মরদেহ দেশে আনা এবং দাফন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা পাওয়ায় নিহতদের পরিবার কিছুটা হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পেয়েছে। স্বজনরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জানিয়েছেন, প্রবাসে থাকা অবস্থায় কোনো পরিবারের সদস্যের মৃত্যু হলে মরদেহ দেশে ফেরানো থেকে শুরু করে দাফন পর্যন্ত নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কানাইঘাটে প্রবাসীদের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের জুন মাসেও কাতারের শাহানিয়া এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় কানাইঘাট উপজেলার পাঁচ প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত হন। ২১ জুনের ওই দুর্ঘটনায় মোট ছয়জন প্রাণ হারান। তাদের মধ্যে পাঁচজনই ছিলেন কানাইঘাটের বাসিন্দা। পরে ৩০ জুন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-২২৬ ফ্লাইটে নিহত পাঁচ বাংলাদেশির মরদেহ সিলেটের এম এ জি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বাংলাদেশ ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অর্থায়নে মরদেহগুলো দেশে আনা হয়।
একই উপজেলার একাধিক পরিবারের প্রবাসী সদস্যের বিদেশের মাটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর ঘটনা স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগও বাড়িয়েছে। কানাইঘাটসহ সিলেটের বহু পরিবারের অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে প্রবাসযাত্রা গভীরভাবে যুক্ত। পরিবারের আয় বাড়ানো, সন্তানদের পড়াশোনা, বসতবাড়ি নির্মাণ কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার আশায় অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের পথ বেছে নেন। তাদের নিরাপদে দেশে ফেরা তাই শুধু পরিবারের প্রত্যাশা নয়, পুরো সমাজেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা।
প্রবাসী শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা ও কর্মজীবন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে নিরাপদ যাতায়াতের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কর্মস্থলে যাওয়া-আসা কিংবা বিমানবন্দরের পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রবাসীদের প্রাণহানির খবর প্রায়ই পরিবারগুলোকে অসহনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি করে। একজন প্রবাসী যখন কর্মস্থল থেকে পরিবারের কাছে ফেরার প্রস্তুতি নেন, তখন তার নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু মানুষের অপেক্ষা। সেই অপেক্ষা যখন মরদেহ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়, তখন ক্ষতিটা হয়ে ওঠে আরও গভীর।
আব্দুল করিম ও খালিদ আহমদের মৃত্যুর ঘটনায় লামার তালুক গ্রামের দুটি পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের প্রবাসজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আশা-আকাঙ্ক্ষারও আকস্মিক পরিসমাপ্তি ঘটেছে। স্বজনদের কান্না, প্রতিবেশীদের শোক আর শেষবারের মতো প্রিয় মানুষকে দেখার অপেক্ষার মধ্য দিয়ে এখন তাদের নিজ এলাকায় শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি চলছে।
প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিদের অবদান দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভর করে দেশের অসংখ্য পরিবার। কিন্তু এই অবদানের আড়ালে প্রবাসী পরিবারগুলোর যে অপেক্ষা, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা থাকে, দুর্ঘটনায় মৃত্যু সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। তাই প্রবাসীদের নিরাপত্তা, কর্মস্থলে নিরাপদ যাতায়াত এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সৌদি আরব থেকে আব্দুল করিম ও খালিদ আহমদের মরদেহ দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে তাদের প্রবাসজীবনের অবসান ঘটলেও পরিবার ও স্বজনদের জীবনে তাদের স্মৃতি থেকে যাবে দীর্ঘদিন। যে মানুষগুলো পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন, তাদের ফিরে আসতে হলো নিথর দেহে। কানাইঘাটের এই দুই পরিবারের জন্য সেই বাস্তবতা নিঃসন্দেহে এক গভীর ও অপূরণীয় শোকের অধ্যায় হয়ে থাকবে।


