প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে সিলেটে এবার বাড়ছে আয়োজনের পরিধি। উৎসবকে শান্তিপূর্ণ, নির্বিঘ্ন ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পূজা উদযাপন কমিটিগুলো। এরই অংশ হিসেবে পূজামণ্ডপে আতশবাজি ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরক্তি বা উদ্বেগ তৈরি করতে পারে—এমন কার্যক্রম থেকেও বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।
বুধবার (৭ অক্টোবর) দুর্গাপূজা উপলক্ষে আয়োজিত প্রস্তুতিমূলক সভায় সভাপতির বক্তব্যে সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন এসব নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পূজামণ্ডপে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিসিটিভি স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত দায়িত্ব পালনের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
এবার সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে ৬৩৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে সিলেট জেলায় সর্বজনীন ৪৪৮টি ও পারিবারিক ২৬টিসহ মোট ৪৭৪টি মণ্ডপ এবং মহানগর এলাকায় সর্বজনীন ১৪৬টি ও পারিবারিক ১৬টিসহ মোট ১৬২টি মণ্ডপ রয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার মণ্ডপের সংখ্যা ১৮টি বেড়েছে। আগামী ১৮ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এত বড় পরিসরে উৎসব আয়োজনের কারণে নিরাপত্তা ও জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে প্রশাসন। জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি পূজামণ্ডপে পূজা উদযাপন কমিটি, আনসার সদস্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করতে হবে। মণ্ডপের ভেতর ও আশপাশে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে বিকল্প হিসেবে জেনারেটরের ব্যবস্থা রাখার কথাও বলা হয়েছে।
আতশবাজি বন্ধের নির্দেশনার পেছনে মূল লক্ষ্য হিসেবে উঠে এসেছে দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বস্তি এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। জেলা প্রশাসক স্পষ্ট করে বলেছেন, এমন কোনো কার্যক্রম করা যাবে না, যাতে মণ্ডপে আসা মানুষ বা আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে বিরক্তি কিংবা উদ্বেগ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে শব্দ, ভিড়, যানজট এবং বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ফলে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি জনস্বস্তির বিষয়টিও প্রশাসনের নির্দেশনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় সিসিটিভি স্থাপনের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি মণ্ডপে ক্যামেরা স্থাপন এবং দায়িত্ব পালনের তথ্য সংরক্ষণের জন্য ডিউটি রেজিস্টার যথাযথভাবে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ সহজ হবে।
সিলেটের জেলা প্রশাসন একই সঙ্গে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিষয়েও সতর্ক করেছে। জেলা প্রশাসক বলেছেন, পূজাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য, ছবি বা ভিডিও প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় যাচাই না করা খবর থেকে অযথা আতঙ্ক বা উত্তেজনা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে কোনো ঘটনা নিয়ে নিজের হাতে আইন তুলে না নিয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে কোনো ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শুধু জেলা পর্যায়ে নয়, উপজেলা পর্যায়েও সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় পূজা উদযাপন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সমন্বয়ের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নিয়ে মনিটরিং টিম গঠন করা হবে। প্রয়োজনে বিশিষ্ট নাগরিকদের সমন্বয়ে উপজেলা পর্যায়ে ভিজিল্যান্স টিম গঠনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে বলে সভায় জানানো হয়।
এদিকে সিলেট মহানগর এলাকাতেও দুর্গাপূজা ঘিরে নিরাপত্তা প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। এর আগে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, নগরের পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকেও মণ্ডপকেন্দ্রিক নজরদারি ও সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উৎসবের শেষ পর্যায়, অর্থাৎ প্রতিমা বিসর্জনের সময়ও যাতে শৃঙ্খলা বজায় থাকে, সে বিষয়ে আলাদা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক সিলেট মহানগর এলাকায় রাত ৯টার মধ্যে এবং জেলার অন্যান্য এলাকায় সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বিসর্জন কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য পূজা উদযাপন কমিটিগুলোর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। নির্ধারিত সময়সূচি অনুসরণ করলে একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে, অন্যদিকে যানবাহন চলাচল ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলেও বিঘ্ন কমবে।
দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলারও আবহ তৈরি করে। পূজামণ্ডপগুলোতে ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী মানুষের সমাগম ঘটে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষ—সব বয়সের দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে মণ্ডপগুলো উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। তাই নিরাপত্তার পাশাপাশি এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি, যেখানে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে উৎসবে অংশ নিতে পারেন এবং অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও অপ্রয়োজনীয় বিঘ্ন না ঘটে।
প্রশাসনের সাম্প্রতিক নির্দেশনায় সেই সমন্বয়ের বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে। একদিকে পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা, আলো, বিদ্যুৎ, সিসিটিভি ও দায়িত্ব বণ্টনের মতো বাস্তব প্রস্তুতি; অন্যদিকে আতশবাজি ও উদ্বেগ সৃষ্টিকারী কার্যক্রম বন্ধ, গুজব প্রতিরোধ এবং যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে এবারের দুর্গোৎসবে প্রশাসন শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই নয়, উৎসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
সিলেটে এবার ৬৩৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন হওয়ায় প্রশাসনের সামনে দায়িত্বও তুলনামূলকভাবে বড়। মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থাপনা ও তথ্য আদান-প্রদানে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়ায় পূজা উদযাপন কমিটিগুলোর দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে শারদীয় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে—এমন প্রত্যাশাই জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। পূজা উদযাপন কমিটি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার আহ্বান জানানো হয়েছে। উৎসবের আনন্দ যেন নিরাপত্তা, জনস্বস্তি ও পারস্পরিক সম্প্রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উদযাপিত হয়, এবারের প্রস্তুতিমূলক সভার নির্দেশনাগুলোতে মূলত সেই বার্তাই উঠে এসেছে।


