প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চার আসামির বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ফলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী যেকোনো দিন এ মামলার রায় ঘোষণা হতে পারে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) ট্রাইব্যুনাল-২-এ রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর বিচারিক প্যানেল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে মামলাটির শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।
মামলার অন্য তিন আসামি হলেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, চার আসামিই বর্তমানে পলাতক।
মামলাটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে মোট তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলন দমনের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা, কুষ্টিয়ায় একটি বৈঠকের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ এবং জুলাই আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগগুলো মামলার বিচারিক পর্বে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত সাক্ষ্য, নথি ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনালের রায়ে নির্ধারিত হবে।
রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্কে মাহবুবউল আলম হানিফের রাজনৈতিক অবস্থান ও তৎকালীন ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরে। প্রসিকিউশনের দাবি, তিনি আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে আন্দোলন দমনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং অধীনস্তদের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছেন। টেলিফোনে কথোপকথন ও নির্দেশনার বিষয়টিও রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তির অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, হানিফ একজন বেসামরিক রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আন্দোলন দমনের কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ এসব কর্মকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করে ট্রাইব্যুনালের সামনে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেছে। তবে এগুলো রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ও যুক্তি; মামলার চূড়ান্ত সত্যতা এবং আসামিদের দায় ট্রাইব্যুনালের রায়ের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
মামলার বিচারিক কার্যক্রমে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ১১ মে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করে। এরপর কয়েক দফায় শুনানি শেষে গত ৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষ তাদের যুক্তিতর্ক শেষ করে। বুধবার আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর মামলার বিচারিক শুনানি শেষ পর্যায়ে পৌঁছে।
রাষ্ট্রপক্ষ তাদের যুক্তিতর্কে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে। ৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার সময় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এ আবেদন জানানো হয়। এরপর ৭ অক্টোবর আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের জন্য দিন নির্ধারণ করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। নির্ধারিত দিনে উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হওয়ায় এখন মামলাটি রায়ের অপেক্ষায়।
মামলার পটভূমি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত। কুষ্টিয়ায় ওই সময় সংঘটিত সহিংসতায় ছয়জন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হন। এসব ঘটনার তদন্তের পর মাহবুবউল আলম হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ৬ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। পরবর্তী সময়ে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেন এবং ২ নভেম্বর চার আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ, নথি উপস্থাপন এবং দুই পক্ষের যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যায়। দীর্ঘ এই প্রক্রিয়া শেষে এখন রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে মামলাটি।
মামলার শুনানিতে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে দেওয়া একটি বক্তব্যের কথাও রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। প্রসিকিউশনের দাবি, ওই বক্তব্যসহ অন্যান্য সাক্ষ্য ও নথিপত্রে আন্দোলন দমন, নির্দেশনা ও সমন্বয়ের বিষয় উঠে এসেছে। এসব প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্ব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ট্রাইব্যুনালই দেবেন।
এই মামলার বিচার কেবল চার আসামির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিষ্পত্তির বিষয় নয়; জুলাই আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়ায় ঘটে যাওয়া সহিংসতার বিচারিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময়ের ঘটনাগুলোতে নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের জন্য বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের যথাযথ বিচারিক পরীক্ষা এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও একটি ফৌজদারি বিচারের মৌলিক বিষয়।
আদালতে কোনো পক্ষের বক্তব্য বা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় না, যতক্ষণ না বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত বা ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দেন। এ মামলাতেও রাষ্ট্রপক্ষ তাদের অভিযোগ ও প্রমাণ উপস্থাপন করেছে এবং আসামিপক্ষ তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পেয়েছে। এখন বিচারিক প্যানেল উপস্থাপিত সাক্ষ্য, নথি ও আইনগত যুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে রায় দেবেন।
মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখার অর্থ হলো, ট্রাইব্যুনালে এ পর্যায়ের শুনানি শেষ হয়েছে এবং এখন বিচারিক সিদ্ধান্ত ঘোষণার পালা। তবে রায় ঘোষণার নির্দিষ্ট তারিখ বুধবারের আদেশে জানানো হয়নি। ফলে আগামী কোনো নির্ধারিত দিনে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করতে পারেন।
কুষ্টিয়ার ছয় হত্যার এই মামলার দিকে তাই সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও নজর রয়েছে। একদিকে নিহতদের পরিবারগুলো দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়, অন্যদিকে আসামিপক্ষও তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, দীর্ঘ শুনানি ও যুক্তিতর্কের পর মামলাটি এখন রায়ের দ্বারপ্রান্তে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর পরবর্তী আদেশেই নির্ধারিত হবে এই মামলার বিচারিক পরিণতি। তবে রায় ঘোষণার আগ পর্যন্ত আসামিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো আইনগতভাবে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

