প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের জাফলং সীমান্ত দিয়ে এক গৃহবধূকে ভারতে পাচারের চেষ্টার অভিযোগে তাঁর স্বামীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ। একই অভিযানে পাচারের শিকার হতে যাওয়া ওই নারীকে একটি রিসোর্ট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ভুক্তভোগী নিজেই বাদী হয়ে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেছেন। মঙ্গলবার গ্রেপ্তার চারজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে সোমবার (৫ অক্টোবর) রাতে জাফলংয়ের বল্লাঘাট এলাকার একটি রিসোর্টে। রাত ৮টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশের একটি দল সেখানে অভিযান চালায়। অভিযানে ওই গৃহবধূকে উদ্ধার করার পাশাপাশি চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে উদ্ধার হওয়া নারীর স্বামীও রয়েছেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার আওলাতলী গ্রামের আব্দুল লতিফের ছেলে আশিকুর রহমান, নিশ্চাম গ্রামের ফিরোজ মিয়ার ছেলে জহিরুল ইসলাম, পালগাঁও গ্রামের মোনছের আলীর ছেলে কাওছার এবং গোবুদিয়া গ্রামের আবদুল করিমের ছেলে সাগর মিয়া। পুলিশ তাঁদের মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আশিকুর রহমান প্রায় তিন মাস আগে ওই নারীকে বিয়ে করেন। অভিযোগ রয়েছে, বিয়ের পর থেকেই স্ত্রীকে ভারতে পাচারের পরিকল্পনা করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে তাঁকে ভারতে পাচার করার উদ্দেশ্যে জাফলংয়ে নিয়ে আসা হয়। তবে এই অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভ্রমণের কথা বলে ওই নারীকে জাফলংয়ে নিয়ে আসেন তাঁর স্বামী। পরে তাঁরা বল্লাঘাট এলাকার একটি রিসোর্টে অবস্থান নেন। কিছু সময় পর আশিকুরের তিন বন্ধু সেখানে আসেন। পুলিশ ও মামলার সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সেখানে পাচারসংক্রান্ত কথাবার্তা শুনে সন্দেহ হয় ওই নারীর। এরপর তিনি পুলিশকে ফোন করে বিষয়টি জানান।
খবর পেয়ে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশের অভিযানে ওই নারীকে উদ্ধার করা হয় এবং তাঁর স্বামীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্থানীয় ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে পুলিশের উপপরিদর্শক রাজিব রায়ের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর উদ্ধার হওয়া নারী খুকি আক্তার মীম বাদী হয়ে গোয়াইনঘাট থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেন। মামলায় তাঁর স্বামীসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার ভিত্তিতেই তাঁদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ওই নারীকে চার লাখ টাকার বিনিময়ে ভারতে পাচারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে এই অর্থ লেনদেনের অভিযোগ পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে কতটা প্রমাণিত হয়েছে, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে বিস্তারিত নথি বা আদালতের সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি মামলার অভিযোগ ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় জাফলং দীর্ঘদিন ধরে পর্যটকদের কাছে পরিচিত একটি স্থান। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও এলাকাটি বিশেষ নজরদারির আওতায় থাকে। মানব পাচারের মতো অপরাধ ঠেকাতে সীমান্তবর্তী এলাকায় পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেটের সীমান্ত দিয়ে মানব পাচারের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে সীমান্তবর্তী এলাকা ব্যবহার করে মানুষকে অন্য দেশে পাচারের চেষ্টা বা পাচারকারীদের তৎপরতার অভিযোগ সামনে এসেছে। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের অনেক সময় চাকরি, ভ্রমণ বা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখানো হয়। তবে এবারের ঘটনায় পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ভুক্তভোগীর স্বামীই। তাঁর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে পাচারের পরিকল্পনায় যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
মানব পাচারের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, বৃহত্তর সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ তৈরি করে। বিশেষ করে পরিচিত বা স্বজনের মাধ্যমে কেউ পাচারের শিকার হলে ঝুঁকিটি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সচেতনতামূলক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা মানেই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। এ ঘটনায় পুলিশ তদন্ত করবে এবং মামলার নথি ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আইনগতভাবে অভিযুক্ত হিসেবেই বিবেচনা করা হবে।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে পাচারের শিকার হতে যাওয়া নারীকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং তাঁর স্বামীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ভুক্তভোগী নারী নিজেই বাদী হয়ে মামলা করেছেন।
ওসি আরও জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় মানব পাচার প্রতিরোধে পুলিশের নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে। গ্রেপ্তার চারজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টিও তিনি নিশ্চিত করেছেন।
এই ঘটনায় দ্রুত পুলিশি অভিযান চালিয়ে একজন সম্ভাব্য ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা গেলেও মানব পাচার প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় অপরাধী চক্রের গতিবিধি নজরে রাখা, সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
জাফলংয়ের রিসোর্ট থেকে ওই গৃহবধূকে উদ্ধারের পর এখন মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে নজর রয়েছে। গ্রেপ্তার চারজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে মানব পাচারের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তদন্তে সেটিও বেরিয়ে আসতে পারে।
ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় মানব পাচারের ঝুঁকি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ভ্রমণ বা অন্য কোনো অজুহাতে কাউকে সীমান্তবর্তী এলাকায় নেওয়ার ক্ষেত্রে সন্দেহজনক পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত পরিবারের সদস্য বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর সুযোগ থাকা জরুরি।
এদিকে মামলার বাদী ও উদ্ধার হওয়া নারী বর্তমানে পুলিশের হেফাজত ও আইনগত সুরক্ষার আওতায় রয়েছেন কি না, সে বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর পরবর্তী নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো পৃথক বক্তব্যও প্রকাশিত হয়নি। ফলে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো দাবি না করে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার পরবর্তী তথ্যের অপেক্ষা করাই যুক্তিসংগত।
সিলেটের জাফলংয়ে এই অভিযানের পর পুলিশের পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকায় মানব পাচারবিরোধী নজরদারি আরও জোরদারের কথা জানানো হয়েছে। এখন তদন্তে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র কতটা স্পষ্ট হয় এবং মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া কোন দিকে এগোয়, সেটিই দেখার বিষয়।


