প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশের গাড়ি শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে জাপানের টয়োটা তুশো করপোরেশনের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ। বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদন এবং বিশেষ করে হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিকল বা এইচইভি উৎপাদন শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে টয়োটা তুশো। প্রতিষ্ঠানটির উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালে দেশের একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে উৎপাদন অবকাঠামো তৈরির কাজ শুরু হতে পারে এবং ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে টয়োটা তুশো করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ইচিরো কাশিতানির নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে। বৈঠকে বাংলাদেশে টয়োটার কার্যক্রম সম্প্রসারণ, সম্ভাব্য বিনিয়োগ, গাড়ি উৎপাদন, বিতরণব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বৈঠকের বিভিন্ন বিষয় গণমাধ্যমকে জানান।
টয়োটা তুশোর প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীকে জানান, বাংলাদেশে একটি গাড়ি উৎপাদন কার্যক্রম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৭ সালে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিকল উৎপাদন শিল্প প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২০২৯ সালকে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনাকে ‘বাংলাদেশের সঙ্গে, বাংলাদেশের জন্য’—এই উন্নয়ন দর্শনের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা হয়েছে।
গাড়ি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের এমন উদ্যোগ বাংলাদেশের শিল্প খাতের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। কারণ একটি পূর্ণাঙ্গ গাড়ি উৎপাদন শিল্প কেবল গাড়ি তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যন্ত্রাংশ, সরবরাহব্যবস্থা, পরিবহন, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং বিভিন্ন ধরনের সহায়ক শিল্পেরও বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়। বৈঠকে টয়োটা পক্ষও জানিয়েছে, তাদের প্রস্তাবিত উদ্যোগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈঠকে বলেছেন, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল, প্রতিযোগিতামূলক ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা, অবকাঠামোগত সুবিধা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথাও তিনি জানান। টয়োটা তুশোর বিনিয়োগ ও বাংলাদেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণের আগ্রহকে তিনি স্বাগত জানান।
বৈঠকে শুধু গাড়ি উৎপাদন নয়, বাংলাদেশে টয়োটার ব্যবসা সম্প্রসারণের আরও কয়েকটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়েও আলোচনা হয়েছে। টয়োটা বাংলাদেশের ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক দেশের সব বিভাগীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা প্রতিনিধিদল জানিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টয়োটার গাড়ি ও সংশ্লিষ্ট সেবা আরও সহজলভ্য করার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। টয়োটা তুশো এসব খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখালে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে বলেও তিনি জানান।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে হাইব্রিড গাড়িকে ভবিষ্যৎ পরিবহন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হয়। প্রচলিত ইঞ্জিনের সঙ্গে বৈদ্যুতিক মোটর ও ব্যাটারি প্রযুক্তির সমন্বয়ে হাইব্রিড গাড়ি পরিচালিত হয়। ফলে বিদ্যুৎচালিত পরিবহনের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি প্রচলিত জ্বালানি ব্যবস্থার সঙ্গেও এর সামঞ্জস্য থাকে। বাংলাদেশে যদি স্থানীয় পর্যায়ে এই ধরনের গাড়ি উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে ওঠে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের অটোমোবাইল শিল্পে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে প্রস্তাবিত কারখানা এখনো পরিকল্পনা ও প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৭ সালে কাজ শুরু এবং ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনের লক্ষ্য ঘোষণা করা হলেও কারখানার নির্দিষ্ট অবস্থান, উৎপাদন সক্ষমতা, বিনিয়োগের পরিমাণ কিংবা উৎপাদিত গাড়ির মডেল সম্পর্কে বৈঠক-পরবর্তী প্রকাশিত তথ্যগুলোতে বিস্তারিত জানানো হয়নি। ফলে এসব বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো ধারণা দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অঞ্চলে এইচইভি উৎপাদন শিল্প প্রতিষ্ঠাই পরিকল্পনার মূল বিষয়।
বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদনের সম্ভাব্য নতুন এই উদ্যোগের সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। টয়োটা বাংলাদেশের তরুণদের জন্য কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভবিষ্যৎ শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য উদ্যোগের কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে।
এ ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে দেশের তরুণদের জন্য নতুন ধরনের কর্মদক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অটোমোবাইল প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, উৎপাদনপ্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত কাজে স্থানীয় জনবলের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগের বাস্তবায়ন, প্রশিক্ষণের পরিধি এবং স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থার বিকাশের ওপর।
বাংলাদেশের শিল্পায়নের পরবর্তী ধাপে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। গাড়ির মতো প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হলে এর সঙ্গে দেশীয় যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও সহায়ক শিল্পের বিকাশের সুযোগও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্প খাতের সংযোগ আরও জোরদার হতে পারে।
টয়োটার প্রস্তাবিত উদ্যোগকে তাই শুধু একটি গাড়ি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা হিসেবে দেখার পাশাপাশি বাংলাদেশের অটোমোবাইল শিল্পের সম্ভাব্য রূপান্তরের একটি অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে জমি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, সরবরাহব্যবস্থা, দক্ষ জনবল, নীতিগত সহায়তা এবং বিনিয়োগ বাস্তবায়নের মতো বিভিন্ন বিষয় সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। টয়োটা তুশোর পক্ষ থেকে মোবিলিটি ডিভিশনের সিইও শিগেরু হারাদা, টয়োটা বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট প্রেমমিত সিংসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে অংশ নেন।
টয়োটা তুশোর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের গাড়ি শিল্পে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। বিশেষ করে হাইব্রিড গাড়ি উৎপাদনের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিভাগে টয়োটার বিতরণ ও সেবা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ হলে ভোক্তাদের জন্যও সেবার পরিধি বাড়তে পারে।
তবে ঘোষিত পরিকল্পনা থেকে বাস্তব উৎপাদনে যেতে আরও কয়েকটি ধাপ পেরোতে হবে। বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক কাঠামো, কারখানার অবকাঠামো নির্মাণ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, প্রযুক্তি ও জনবল প্রস্তুত এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনা—সবকিছু সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। টয়োটা তুশো ও বাংলাদেশ সরকারের পরবর্তী কার্যক্রমেই স্পষ্ট হবে, ২০২৭ সালে ঘোষিত প্রস্তুতিমূলক কাজ কতটা দ্রুত এগোয় এবং ২০২৯ সালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে বাস্তবায়িত হয়।
এই মুহূর্তে নিশ্চিত বিষয় হলো, বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদন এবং বিশেষ করে হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিকল শিল্প গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেছে টয়োটা তুশো। সরকারের পক্ষ থেকেও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, নীতি সহায়তা ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশের অটোমোবাইল শিল্প, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বৃহত্তর শিল্পায়নের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।


