প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
নতুন অর্থবছরের শুরুতেই বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপের চিত্র সামনে এসেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৮২ কোটি মার্কিন ডলারে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল ২৯৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যসংক্রান্ত তথ্য থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা মোট ১ হাজার ২২০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছেন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮৮ কোটি ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ।
অন্যদিকে একই সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৮৩৮ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ রপ্তানি আয় বাড়লেও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির গতি ছিল অনেক বেশি। এর ফলে দুই মাসেই বাণিজ্য ঘাটতি বড় আকার ধারণ করেছে।
অর্থনীতির এই হিসাবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয়। জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে বাংলাদেশকে প্রায় ২৪৯ কোটি ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১২৪ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানির ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আমদানি ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। জ্বালানি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আমদানি উপাদান হওয়ায় এ খাতে ব্যয় দ্রুত বেড়ে গেলে তা সরাসরি বাণিজ্য ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে। জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ের ওপরও পরোক্ষ চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে সব ধরনের পণ্যের আমদানি ব্যয় বাড়েনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আলোচিত সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে চাল আমদানির ব্যয়ও কমেছে প্রায় ৭৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে কয়েকটি নির্দিষ্ট খাত, যার মধ্যে জ্বালানি আমদানির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবে আপাতত কিছুটা স্বস্তির চিত্র রয়েছে। জুলাই-আগস্ট সময়ে চলতি হিসাবে ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ উদ্বৃত্ত ছিল ১৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ চলতি হিসাবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এর পেছনে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য ও সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত অর্থনীতির জন্য স্বস্তির একটি জায়গা হলেও আর্থিক হিসাবে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে চাপের। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আর্থিক হিসাবে ১১৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের ঘাটতি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। আর্থিক হিসাবের মধ্যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ, বিভিন্ন ধরনের ঋণ, বাণিজ্যঋণ এবং অন্যান্য বৈদেশিক আর্থিক প্রবাহের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে।
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও কিছুটা দুর্বলতা দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই এসেছে ২২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ২৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিট এফডিআই কমেছে।
সব মিলিয়ে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যেও ঘাটতি নিয়ে অর্থবছরের শুরু হয়েছে। জুলাই-আগস্ট সময়ে সামগ্রিক ব্যালান্সে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার পরও বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক চিত্রে চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাণিজ্য ঘাটতি নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে ঘাটতির আকার ও এর পেছনের কারণ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ, শিল্পের কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির জন্য বাড়ে, তাহলে তা ভবিষ্যতে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর ভিত্তি তৈরি করতে পারে। কিন্তু জ্বালানি বা অন্যান্য অপরিহার্য পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বাড়লে তার বিপরীতে সমপরিমাণ রপ্তানি আয় তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও এই দ্বৈত পরিস্থিতি স্পষ্ট। একদিকে রপ্তানি আয় বাড়ছে এবং প্রবাসী আয় চলতি হিসাবকে উদ্বৃত্ত রাখতে সহায়তা করছে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়ায় পণ্য বাণিজ্যের ঘাটতি বড় হচ্ছে। ফলে অর্থনীতির জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আমদানি ব্যয়ের কাঠামো, জ্বালানি বাজারের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিকতা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত পরিসংখ্যানেও আগের অর্থবছরের তুলনায় বৈদেশিক খাতের কিছু উন্নতি ও কিছু চাপ—দুই ধরনের চিত্রই দেখা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাসিক প্রতিবেদনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ২০৩ কোটি ৯৯ লাখ ডলার এবং চলতি হিসাবের ঘাটতি মাত্র ১৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার দেখানো হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে আর্থিক হিসাবে ৩৫৯ কোটি ৫০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্তের তথ্যও রয়েছে।
এ অবস্থায় চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের তথ্যকে পুরো অর্থবছরের প্রবণতার চূড়ান্ত চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের গতিপ্রকৃতি, দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, প্রবাসী আয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং আমদানির চাহিদা আগামী মাসগুলোতে পরিস্থিতিকে পরিবর্তন করতে পারে।
তবে অর্থবছরের শুরুতেই জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের ব্যয় এবং পণ্য বাণিজ্যে ৩৮২ কোটি ডলারের ঘাটতি অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় যদি রপ্তানি আয়ের তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ধরে রাখা আরও কঠিন হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের জন্য এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের বাড়তি চাপ কতদিন থাকবে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি ও প্রবাসী আয় কতটা শক্তিশালী থাকে। কারণ রপ্তানি ও রেমিট্যান্স থেকে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ শক্তিশালী থাকলে আমদানি ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার আয় দুর্বল হয়ে পড়লে বাণিজ্য ঘাটতির প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।
নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের পরিসংখ্যান তাই বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের সামনে একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ—দুটিই তুলে ধরেছে। রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবাহ ধরে রাখার পাশাপাশি জ্বালানি ও অন্যান্য আমদানি ব্যয়ের ওপর নজর রাখা এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানোই সামনে অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।


