কলমাকান্দায় সভায় শিক্ষিকাকে চড়, বিভাগীয় মামলার প্রস্তুতি

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

নেত্রকোনার কলমাকান্দায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভা চলাকালে সহকারী শিক্ষিকা স্ত্রীকে চড় মারার অভিযোগ উঠেছে একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও তাঁর স্বামী মো. খুরশেদ আলমের বিরুদ্ধে। ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহ পর মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এরই মধ্যে ঘটনার তদন্ত শেষ করে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শহীদুল আজম জানিয়েছেন, বিদ্যালয়ের মতো কর্মস্থলে একজন শিক্ষক আরেকজন শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতে পারেন না। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।

ঘটনাটি ঘটে গত ১৫ সেপ্টেম্বর কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বিদ্যালয়ে স্টাফ সভা চলছিল। সভার একপর্যায়ে প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে সহকারী শিক্ষক খুরশেদ আলমের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পাশে বসে থাকা খুরশেদ আলমের স্ত্রী এবং একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তখনই তাঁর সঙ্গে খুরশেদের কথা-কাটাকাটি হয় এবং একপর্যায়ে তাঁকে চড় মারার অভিযোগ ওঠে।

ঘটনার একটি ভিডিও মঙ্গলবার বিকেল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ভিডিওটির দৈর্ঘ্য প্রায় এক মিনিট ৫৮ সেকেন্ড। ভিডিওতে সভাস্থলে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে খুরশেদ আলমের উত্তপ্ত কথোপকথন দেখা যায়। পরে তাঁর স্ত্রী তাঁকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে তাঁকে চড় মারার দৃশ্য দেখা যায় বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। তবে ঘটনাটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার দিন ঘটেনি; এর প্রায় ২০ দিন আগে বিদ্যালয়ের সভায় ঘটনাটি ঘটেছিল। ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার পাঁচ দিন পর, ২০ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়। উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা শীতেষ চন্দ্র পালের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি ঘটনার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন জমা দেয়। সোমবার বিকেলে দেওয়া ওই প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কলমাকান্দা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোশাররফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এ কারণে অভিযুক্ত শিক্ষক খুরশেদ আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে সুপারিশ করা হয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শহীদুল আজমও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকলেও বিদ্যালয় একটি কর্মস্থল। সেখানে একজন শিক্ষক অন্য একজন শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার সুযোগ নেই। এ ধরনের আচরণ চাকরির বিধিমালার পরিপন্থী এবং অসদাচরণের শামিল। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এদিকে অভিযুক্ত শিক্ষক মো. খুরশেদ আলম ঘটনার বিষয়ে অনুতপ্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, তিনি প্রায় আট বছর ধরে ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন এবং তাঁর স্ত্রী প্রায় পাঁচ বছর ধরে সেখানে কর্মরত। ঘটনার সময় তিনি নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি বলে জানান। ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি নিজেও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন বলে উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, তিনি ও তাঁর স্ত্রী বর্তমানে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে, ঘটনার বিষয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষিকার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে ঘটনার বিষয়ে তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা বা বক্তব্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো কর্মস্থলে পেশাগত আচরণ ও পারস্পরিক সম্মানের গুরুত্ব। বিদ্যালয় শুধু শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জায়গা নয়; শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্যও এটি একটি পেশাগত পরিবেশ। সেখানে মতপার্থক্য বা কোনো বিষয়ে বিরোধ তৈরি হলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রত্যাশাই স্বাভাবিক। কোনো ধরনের শারীরিক আচরণ সেই পেশাগত পরিবেশকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

বিশেষ করে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কাছে আচরণ, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হন। ফলে একটি বিদ্যালয়ের ভেতরে শিক্ষক-শিক্ষকের আচরণও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রশাসনিকভাবে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

তবে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে এবং সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিভাগীয় মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে—এ পর্যায় পর্যন্তই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেছে। চূড়ান্ত শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত কী হবে, তা বিভাগীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই জানা যাবে।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে মানুষের নজরে আসে। বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোনে ধারণ করা কোনো দৃশ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে কর্মস্থলে দায়িত্বশীল আচরণ এবং ব্যক্তিগত ও পেশাগত সীমারেখা রক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হলে তা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই সমাধান করা উচিত। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ যাতে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, স্বাভাবিক ও ইতিবাচক থাকে, সেটি নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। কোনো বিরোধ যেন ব্যক্তিগত উত্তেজনা বা শারীরিক আচরণে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষেরও প্রয়োজনীয় ভূমিকা রয়েছে।

কলমাকান্দার ঘটনাটিতে এখন নজর রয়েছে বিভাগীয় প্রক্রিয়ার দিকে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় বিভাগীয় মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরবর্তী প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত শিক্ষক নিজের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাবেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে।

একই বিদ্যালয়ে কর্মরত স্বামী-স্ত্রী দুই শিক্ষকই বর্তমানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযুক্ত শিক্ষক জানিয়েছেন। তবে ঘটনাটি যে পেশাগত পরিবেশ ও সামাজিক আলোচনায় প্রভাব ফেলেছে, তা স্পষ্ট। এখন প্রশাসনিক তদন্ত ও বিভাগীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টির আনুষ্ঠানিক নিষ্পত্তিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত যে বার্তাটি সামনে এনেছে, তা হলো—কর্মস্থলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিচয়ের বাইরে পেশাগত শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আচরণ শুধু তাঁদের নিজেদের বিষয় নয়; এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তা এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষকতার পেশার মর্যাদাও জড়িত। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে বিদ্যালয় পর্যায়ে পেশাগত পরিবেশ আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

কুষ্টিয়ার ছয় হত্যা মামলায় হানিফসহ চারজনের রায় যেকোনো দিন

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

১৭ অক্টোবরের ছুটি বাতিল, খোলা থাকবে সরকারি অফিস

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জ্বালানি আমদানির চাপে ৩৮২ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নগরবাসীর সেবায় আরও জনবান্ধব সিসিক চান প্রশাসক

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চুনারুঘাটে ঘুষের ভিডিও, আরেক এএসআই প্রত্যাহার

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

কুষ্টিয়ার ছয় হত্যা মামলায় হানিফসহ চারজনের রায় যেকোনো দিন

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

১৭ অক্টোবরের ছুটি বাতিল, খোলা থাকবে সরকারি অফিস

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জ্বালানি আমদানির চাপে ৩৮২ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নগরবাসীর সেবায় আরও জনবান্ধব সিসিক চান প্রশাসক

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চুনারুঘাটে ঘুষের ভিডিও, আরেক এএসআই প্রত্যাহার

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাফলংয়ে স্ত্রীকে ভারতে পাচারের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ৪

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটের ১৫ ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের উদ্যোগ

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাংলাদেশে টয়োটার হাইব্রিড গাড়ির কারখানা, কাজ শুরু ২০২৭

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ