সিলেট বিভাগে সেপ্টেম্বরে সড়কে ঝরল ২৬ প্রাণ

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেট বিভাগের চার জেলায় সেপ্টেম্বর মাসে ২৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৫১ জন। নিহতদের মধ্যে মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশা ও টমটমের চালক ও আরোহীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বলছে, একদিকে সড়কে প্রাণহানি অব্যাহত থাকলেও অন্যদিকে আগের মাস আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বর মাসে দুর্ঘটনা, নিহত ও আহতের সংখ্যা কমেছে।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সিলেট বিভাগীয় কমিটির সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। রোববার (৪ অক্টোবর) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটি স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য, নিসচার বিভিন্ন শাখার তথ্য এবং অন্যান্য উৎসের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে সিলেট জেলায় আটটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত এবং ১০ জন আহত হয়েছেন। সুনামগঞ্জে চারটি দুর্ঘটনায় দুজন নিহত ও ২৩ জন আহত হয়েছেন। মৌলভীবাজারে নয়টি দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। আর হবিগঞ্জে পাঁচটি দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছেন।

চার জেলার মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মৌলভীবাজারে। সেখানে নয়টি দুর্ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিপরীতে সুনামগঞ্জে দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি—দুই দিক থেকেই তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তবে আহতের সংখ্যার দিক থেকে সুনামগঞ্জে পরিস্থিতি ছিল বেশি উদ্বেগজনক। মাত্র চারটি দুর্ঘটনায় সেখানে ২৩ জন আহত হয়েছেন।

নিহত ২৬ জনের মধ্যে ২২ জন পুরুষ, দুজন নারী এবং দুজন শিশু। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারানো মানুষের বড় অংশই ছিলেন কর্মক্ষম বয়সের পুরুষ। তাদের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের সদস্যকে হারানোর ঘটনা নয়, অনেক ক্ষেত্রে একটি পরিবারের আয়-রোজগারের পথও বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, কর্মক্ষমতা হারানো এবং পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

নিসচার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে ১০ জন মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী এবং ১১ জন সিএনজি অটোরিকশা ও টমটমের চালক ও আরোহী ছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১০ জন চালক এবং দুজন পথচারী প্রাণ হারিয়েছেন। এর অর্থ, সড়কে চলাচলকারী ছোট যানবাহন ও দুই চাকার যান ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা এখনো বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যানবাহন উল্টে যাওয়ার ঘটনায় আটটি দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। মুখোমুখি সংঘর্ষের আটটি ঘটনায় প্রাণ গেছে নয়জনের। এ ছাড়া গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ধাক্কার একটি দুর্ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় বোঝা যায়, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকের দক্ষতা এবং সড়কের নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্ঘটনা কমানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনায় প্রাণহানির হার বেশি হওয়ায় সড়কে চালকদের সতর্কতা এবং যানবাহন পরিচালনার নিয়ম মেনে চলার বিষয়টি সামনে আসে। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অসতর্কভাবে বিপরীতমুখী লেনে প্রবেশ কিংবা চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানো—এ ধরনের আচরণ অনেক সময় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি পরিবারকে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে।

নিসচার প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, অনুমোদনহীন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের মহাসড়কে চলাচল, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা, পথচারীদের অসচেতনতা এবং সড়ক নির্মাণে ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরেই এসব কারণ উঠে আসছে। একটি দুর্ঘটনা সাধারণত একক কোনো কারণে ঘটে না; চালকের আচরণ, যানবাহনের অবস্থা, সড়কের অবকাঠামো, আবহাওয়া, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পথচারীদের আচরণ—সবকিছু মিলেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই দুর্ঘটনা কমাতে শুধু চালকদের ওপর দায় চাপানোর পরিবর্তে সড়ক ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক দুর্বলতাগুলোও চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

মোটরসাইকেল ও সিএনজি-টমটমের মতো অপেক্ষাকৃত ছোট যানবাহনের ব্যবহার সিলেট বিভাগের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। শহর, উপজেলা ও গ্রামীণ এলাকার মধ্যে যাতায়াতে এসব যানবাহনের ওপর অনেক মানুষ নির্ভরশীল। ফলে এসব যানবাহনের চালক ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

নিসচা কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক, সিলেট বিভাগীয় কমিটির সদস্যসচিব ও সিলেট জেলা সভাপতি জহিরুল ইসলাম মিশু জানান, পাঁচটি স্থানীয় দৈনিক ও অনলাইন সংবাদপত্র, দুটি জাতীয় দৈনিকের তথ্য, বিভিন্নভাবে জানা বা প্রকাশিত হয়নি এমন কিছু ঘটনা এবং নিসচার সিলেট বিভাগের বিভিন্ন শাখার তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

তবে সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যানের সঙ্গে আগস্টের তুলনা করলে পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতির চিত্রও দেখা যায়। আগস্ট মাসে সিলেট বিভাগের চার জেলায় ৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৭ জন নিহত এবং ১২২ জন আহত হয়েছিলেন। সেই হিসাবে সেপ্টেম্বরে দুর্ঘটনা কমেছে নয়টি। একই সময়ে নিহতের সংখ্যা কমেছে ২১ জন এবং আহতের সংখ্যা কমেছে ৭১ জন।

অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা এবং হতাহতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই পরিবর্তন আশাব্যঞ্জক হলেও একটি মাসের পরিসংখ্যান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা কঠিন। কারণ সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা মাসভেদে পরিবর্তিত হতে পারে এবং বিভিন্ন ঘটনা সবসময় একইভাবে নথিভুক্ত নাও হতে পারে। তাই ধারাবাহিকভাবে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করা জরুরি।

সড়কে প্রাণহানি কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে চালকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়ানো, ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, মহাসড়কে অনুমোদনহীন যান চলাচল বন্ধ করা, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারে বাধ্য করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা। পাশাপাশি পথচারীদেরও নির্ধারিত স্থান ব্যবহার, রাস্তা পারাপারে সতর্কতা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

সিলেট বিভাগের সড়কগুলো শুধু স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের পথ নয়; ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং আন্তঃজেলা যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এগুলোর গুরুত্ব অনেক। ফলে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা মানে শুধু দুর্ঘটনা কমানো নয়, বরং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিরাপদ রাখা।

প্রতিটি নিহত মানুষের সঙ্গে একটি পরিবার, একটি জীবিকা এবং অনেক মানুষের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে। তাই দুর্ঘটনার পর শুধু হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; কেন দুর্ঘটনা ঘটছে এবং কীভাবে একই ধরনের দুর্ঘটনা ভবিষ্যতে প্রতিরোধ করা যায়, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

সেপ্টেম্বরে সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি আগস্টের তুলনায় কমেছে—এটি অবশ্যই স্বস্তির বিষয়। তবে ২৬টি দুর্ঘটনায় ২৬ জনের মৃত্যু এবং ৫১ জনের আহত হওয়ার ঘটনা এখনো সড়ক নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশা ও টমটমের চালক-আরোহীদের উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি দেখিয়ে দিচ্ছে যে নিরাপদ যান চলাচলের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত নজরদারি, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, চালকদের দায়িত্বশীল আচরণ এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা—এই সবকিছুর সমন্বিত প্রয়াসই পারে সিলেট বিভাগের সড়ককে আরও নিরাপদ করে তুলতে। আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে দুর্ঘটনা কমার ইতিবাচক প্রবণতা যেন সাময়িক না হয়ে ধারাবাহিক উন্নতিতে রূপ নেয়, এখন সেটিই প্রত্যাশা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

সালমান শাহ হত্যা মামলায় ফের জামিন পেলেন না ডন

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

স্থানীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থী কম, উদ্বেগ সিইসির

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কুষ্টিয়ায় পাটওয়ারীর ওপর হামলা, নাহিদের ক্ষোভ

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

তিন দিনে ২০ কোটি ৬০ লাখ ডলার, বাড়ছে রেমিট্যান্স

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট নিয়ে পোস্ট, শাবিপ্রবিতে ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

সালমান শাহ হত্যা মামলায় ফের জামিন পেলেন না ডন

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

স্থানীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থী কম, উদ্বেগ সিইসির

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কুষ্টিয়ায় পাটওয়ারীর ওপর হামলা, নাহিদের ক্ষোভ

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

তিন দিনে ২০ কোটি ৬০ লাখ ডলার, বাড়ছে রেমিট্যান্স

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট নিয়ে পোস্ট, শাবিপ্রবিতে ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাল্লায় তরুণীকে অপহরণের অভিযোগ ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ঢাকা উত্তরে জামায়াতের প্রার্থী সিলেটের সেলিম উদ্দিন

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চুনারুঘাটে দুই রোগীর মৃত্যু, অবহেলার অভিযোগ

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ