প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
একসময় হৃদরোগকে মূলত বয়স্ক মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা হলেও পরিবর্তিত জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি ও মানসিক চাপসহ বিভিন্ন কারণে এখন কম বয়সীদের মধ্যেও হৃদরোগের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। হৃদরোগের সম্ভাব্য লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সিলেটের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে সিলেটে আয়োজিত এক আলোচনা সভা ও গণমুখী সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। মঙ্গলবার সকালে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন সিলেটের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে হৃদরোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কর্মসূচির শুরুতে হৃদরোগ বিষয়ে সচেতনতামূলক একটি র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। পরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন সিলেটের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আমিনুর রহমান লস্করের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা ও গণমুখী সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন জয়েন্ট সেক্রেটারি আবু তালেব মুরাদ। কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বলেন, মানুষের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর মধ্যে হৃদপিণ্ড অন্যতম। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং মানসিক চাপ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তিনি বলেন, হৃদরোগের চিকিৎসায় বাংলাদেশ আগের তুলনায় অনেক অগ্রসর হয়েছে এবং দেশে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা এবং জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী আরও বলেন, শুধু ওষুধ ও চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে রোগ প্রতিরোধের বিষয়েও সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় এমন কারণগুলো সম্পর্কে মানুষের কাছে সহজভাবে তথ্য পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
সিলেটে হৃদরোগ চিকিৎসাসেবার প্রসঙ্গে তিনি জাতীয় অধ্যাপক মরহুম ব্রিগেডিয়ার (অব.) আব্দুল মালিকের অবদানের কথা স্মরণ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সিলেট ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আব্দুল মালিকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। হাসপাতালের জন্য জায়গা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমানের অবদানের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
সেমিনারে হৃদরোগের জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়েও আলোচনা করা হয়। সিলেট ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ইন কার্ডিওলজি ডা. ফারজানা তাজিন হঠাৎ হৃদস্পন্দন বা শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে জীবন রক্ষাকারী জরুরি চিকিৎসা পদ্ধতি সিপিআর নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি হৃদযন্ত্রের জরুরি অবস্থায় দ্রুত সহায়তা ও চিকিৎসাসেবার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
অন্যদিকে হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ইন কার্ডিয়াক সার্জারি ডা. দেওয়ান ইফতেখার রাজা চৌধুরী বাইপাস সার্জারি বা সিএবিজি বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি জানান, ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত সিলেট ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ২৪৯ জন হৃদরোগীর বাইপাস সার্জারি সম্পন্ন হয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. মো. আমিনুর রহমান লস্কর বলেন, হৃদরোগকে শুধু বয়স্কদের রোগ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন বয়সী মানুষ হৃদরোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাই রোগের সম্ভাব্য লক্ষণ ও ঝুঁকি সম্পর্কে সবার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, পারিবারিক ইতিহাস ও জেনেটিক বৈশিষ্ট্য হৃদরোগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর মধ্যে পড়ে। তবে জীবনযাপন ও আচরণগত কিছু বিষয়ও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে ধূমপানের মতো অভ্যাস থেকে বিরত থাকার বিষয়ে তিনি গুরুত্ব দেন।
অধ্যাপক লস্কর আরও বলেন, হৃদরোগের ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। অস্বাভাবিক বা উদ্বেগজনক কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, মানুষ সচেতনতার গুরুত্ব সম্পর্কে জানলেও অনেক সময় দৈনন্দিন জীবনে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করেন না। এই জায়গায় সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন সিলেটের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটির হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি, প্রাইমারি পিসিআই, স্থায়ী ও অস্থায়ী পেসমেকারসহ বিভিন্ন চিকিৎসা ও হৃদরোগ-সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের হিসাবে এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার হৃদরোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘প্রতিটি হৃদস্পন্দনই জীবন’ সামনে রেখে আয়োজিত সেমিনারে হৃদরোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার বিভিন্ন দিক নিয়ে বক্তব্য দেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন সিলেটের সহসভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আলতাফুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী শোয়েব আহমেদ মতিন, কার্যকরী কমিটির সদস্য ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট আফতাব চৌধুরী এবং লিভার ফাউন্ডেশন সিলেটের সিইও শতকতুর রহমান।
অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন সিলেটের পাবলিসিটি সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুস সালাম। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন সিলেটের সোশ্যাল সেক্রেটারি আব্দুল মালিক জাকা, ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন সেক্রেটারি এস আই আজাদ আলী, হাসপাতালের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডা. মো. আব্দুল মুনিম চৌধুরী এবং সহকারী পরিচালক ডা. আলা উদ্দিন আহমেদসহ সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন সিলেট দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। এর অংশ হিসেবে সুবিধাবঞ্চিত হৃদরোগীদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শের ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা হয়। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব সেবায় মোট প্রায় ৫৮ জন রোগী চিকিৎসা ও পরামর্শ গ্রহণ করেন।
হৃদরোগ নিয়ে সচেতনতা তৈরির এমন আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল রোগ প্রতিরোধ, ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করা। চিকিৎসকদের মতে, হৃদরোগের ক্ষেত্রে ঝুঁকির কারণ ও লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেটের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে বক্তারা মূলত একটি বিষয়েই গুরুত্ব দিয়েছেন—হৃদরোগকে কেবল বয়সজনিত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। ব্যক্তির পারিবারিক ইতিহাস বা কিছু ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলেও জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যসচেতনতার মাধ্যমে কিছু ঝুঁকি কমানোর সুযোগ থাকে। তাই হৃদযন্ত্রের সুস্থতার জন্য সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।


