প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটে অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন, চোরাচালান ও পরিবহন শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছে সিলেট জেলা ট্রাক, পিকআপ ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়ন। এ দাবিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বরাবর লিখিত অভিযোগ ও স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া ওই স্মারকলিপিতে গোয়াইনঘাটের ১ নম্বর রুস্তমপুর ইউনিয়নের পীরেরবাজারসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন ও সীমান্তপথে চোরাচালানের সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে স্মারকলিপিতে উত্থাপিত এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বা অভিযুক্ত ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
সংগঠনটির সভাপতি আবু সরকার ও সাধারণ সম্পাদক মো. মাছুম আহমদ লস্কর স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়, পীরেরবাজার এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। শ্রমিক ইউনিয়নের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় ভারত থেকে অবৈধ পথে বিভিন্ন পণ্য আনা এবং সেগুলোর সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। স্মারকলিপিতে গরু, মহিষ, চিনি, জিরা, প্রসাধনসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
স্মারকলিপিতে আরও দাবি করা হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিশেষ করে অবৈধ পণ্য পরিবহনে অস্বীকৃতি জানালে কিংবা সংশ্লিষ্ট চক্রের কথামতো কাজ না করলে শ্রমিকদের হয়রানি ও মারধরের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি। এ ছাড়া বিভিন্ন মামলায় শ্রমিকদের হয়রানি এবং পীরেরবাজার ট্রাক শ্রমিক কার্যালয় ২০২৪ সাল থেকে তালাবদ্ধ করে রাখার অভিযোগও স্মারকলিপিতে তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনকে কেন্দ্র করে বিপুল অর্থ আদায়ের দাবিও করা হয়েছে। শ্রমিক ইউনিয়নের হিসাব অনুযায়ী, বিছনাকান্দি ও গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন কোয়ারি থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এ ছাড়া পান্তুমাই ও মাতুরতল এলাকায় ইজারা-সংশ্লিষ্টতার বাইরে বালু-পাথর উত্তোলন এবং রয়্যালটি আদায়ের অভিযোগও করা হয়েছে। এসব দাবির সুনির্দিষ্টতা যাচাই করতে প্রশাসনিক তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, গোয়াইনঘাটে অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে প্রশাসনের অভিযান চলমান থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ২৪ সেপ্টেম্বর বালির হাওর ও বুধিগাঁও হাওরে উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে অবৈধ বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত চারটি লিস্টার মেশিন ধ্বংস করা হয়। একই অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তিনজনকে মোট ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এর আগে ১০ সেপ্টেম্বরও গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালানো হয়েছিল। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে ওই অভিযানে একাধিক ড্রেজার ধ্বংস এবং বেশ কয়েকজনকে আটক ও জরিমানার তথ্য প্রকাশিত হয়। এতে বোঝা যায়, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা ও অবৈধ উত্তোলন ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান সাম্প্রতিক সময়েও অব্যাহত রয়েছে।
গোয়াইনঘাটের বালু-পাথর উত্তোলন ঘিরে পরিবেশ ও স্থানীয় জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উপজেলার নদী, হাওর ও সীমান্তবর্তী প্রাকৃতিক অঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের জীবিকা, কৃষি, পর্যটন ও পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু-পাথর উত্তোলন হলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, তীরবর্তী এলাকা ও পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বৈধভাবে পরিবহন কাজে যুক্ত শ্রমিকদের কাজের পরিবেশও এতে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সাম্প্রতিক এক স্থানীয় প্রতিবেদনে গোয়াইনঘাটের ঝোমপারে বড় যন্ত্র ব্যবহার করে বালু-পাথর উত্তোলনের অভিযোগ এবং এর ফলে বারকি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার দাবি উঠে এসেছে। সেখানে স্থানীয় শ্রমিকদের জীবিকা নিয়ে উদ্বেগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গোয়াইনঘাটে এক মতবিনিময় সভায় সরকারি সম্পদ রক্ষায় অবৈধ বালুমহাল চালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। সরকারি পর্যায় থেকেও অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
শ্রমিক ইউনিয়নের স্মারকলিপিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হিসেবে উঠে এসেছে পরিবহন শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ। সংগঠনটির অভিযোগ সত্য হলে, কোনো শ্রমিককে অবৈধ পণ্য পরিবহন বা অন্য কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা শুধু শ্রমিক অধিকার নয়, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আবার এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে দায়ী করা বা কোনো ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়। তাই স্মারকলিপিতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় গোয়াইনঘাটে চোরাচালান প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। পাশাপাশি বৈধ পণ্য পরিবহন ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক ও মালিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে বৈধ পরিবহনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপরও পড়তে পারে।
শ্রমিক ইউনিয়ন তাদের স্মারকলিপিতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন ও চোরাচালান বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধ, তাদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পীরেরবাজার ট্রাক শ্রমিক কার্যালয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবিও জানানো হয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, স্মারকলিপিতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর কতটা সত্য এবং এর পেছনে কারা জড়িত। সেই উত্তর মিলবে প্রশাসনিক ও আইনগত তদন্তের মাধ্যমে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের কোনো অংশের ভিত্তি না থাকলে সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার। এতে একদিকে যেমন সরকারি সম্পদ ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষার কাজ এগিয়ে যাবে, অন্যদিকে বৈধভাবে জীবিকা নির্বাহকারী পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যেও আস্থা তৈরি হবে।
গোয়াইনঘাটে সাম্প্রতিক প্রশাসনিক অভিযানগুলো থেকে স্পষ্ট যে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নজরদারি ও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এখন শ্রমিক ইউনিয়নের নতুন অভিযোগের পর চোরাচালান, অবৈধ উত্তোলন এবং শ্রমিক হয়রানির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের তদন্ত ও পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষের।


