প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটে তরুণ চিকিৎসক পদ্মজিৎ চক্রবর্তী প্রান্তের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই তাঁর বাবা পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীরও মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে একটি পরিবারে। মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে বাবা ও একমাত্র ছেলের মৃত্যু ঘিরে মৌলভীবাজার ও সিলেটে সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন। দুজনেরই মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে নিজ নিজ বাসা থেকে এবং উভয় ঘটনাতেই প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে দুটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো তদন্ত ও ময়নাতদন্তের তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকালে মৌলভীবাজার শহরের এম সাইফুর রহমান সড়কে অবস্থিত ভটের ফার্মেসির দ্বিতীয় তলার বাসা থেকে পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় নিজ পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপরের অংশে বসবাস করতেন। পরিবারের সদস্যরা সকালে তাঁর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে বিষয়টি পুলিশকে জানান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভেতর থেকে বন্ধ থাকা দরজা খুলে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ জানিয়েছে, পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে প্রাথমিক তদন্তের পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার রাতেই মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মৌলভীবাজার মডেল থানার উপপরিদর্শক মনোজ কুমার সরকার জানান, প্রাথমিকভাবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি এবং বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, কয়েক দিন আগে পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর চিকিৎসক ছেলে মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। ছেলের মৃত্যুর শোক থেকে পূর্ণেন্দ্র এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন—এমন একটি প্রাথমিক ধারণার কথাও তিনি জানিয়েছেন। তবে এটিকে চূড়ান্ত কারণ হিসেবে দেখছে না পুলিশ।
এর মাত্র ১১ দিন আগে, গত ৭ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর একমাত্র ছেলে পদ্মজিৎ চক্রবর্তী প্রান্তের মরদেহ। ৩১ বছর বয়সী প্রান্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ছিলেন। ওই ঘটনায়ও তাঁকে বাসার ভেতরে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তাঁকে উদ্ধার করেছিল। পরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রান্তের মৃত্যুর ঘটনাটিও শুরু থেকেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, তিনি ও তাঁর স্ত্রী—দুজনই চিকিৎসক। ঘটনার আগের দিন তাঁরা মির্জাজাঙ্গাল এলাকার ওই ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন। পরদিনই বাসা থেকে প্রান্তের মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ তখন প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত শুরু করে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্ত ও তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়।
প্রান্তের মরদেহ উদ্ধারের পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও পুলিশ প্রকাশ্যে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। ময়নাতদন্ত শেষে তাঁর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর মরদেহ মৌলভীবাজারের গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় তখন পর্যন্ত থানায় কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
প্রান্তের মৃত্যুর ১১ দিনের মাথায় তাঁর বাবা পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও বেদনাবিধুর করে তুলেছে। একমাত্র সন্তানকে হারানোর পর একজন বাবার ওপর কী ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়েছিল, সেটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। তবে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পেছনে মানসিক অবস্থা বা পারিবারিক ঘটনাকে সরাসরি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফলই এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তি হতে পারে।
পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীদের পারিবারিক শিকড় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার সাবিয়া গ্রামে। স্থানীয়ভাবে তাঁদের বাড়িটি ‘ভটের বাড়ি’ বা ‘ব্রাহ্মণ বাড়ি’ নামে পরিচিত বলে জানা গেছে। পরিবারটির এলাকায় দীর্ঘদিনের পরিচিতি রয়েছে। পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর স্ত্রীও প্রায় দুই বছর আগে মারা গেছেন। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে হারানোর পর তাঁর জীবনে একের পর এক শোক নেমে এসেছিল।
স্থানীয়দের কাছে বাবা-ছেলের এমন পরপর মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক হয়ে উঠেছে। একটি পরিবারের জন্য স্বাভাবিক জীবনের ধারাবাহিকতা মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে যেন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসক ছেলে প্রান্তের মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা যখন সেই শোক সামলানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন তাঁর বাবার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে নানা ধরনের আলোচনা ছড়িয়ে পড়লেও তদন্তের আগে কোনো অনুমানকে সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া সমীচীন নয়। দুটি ঘটনাতেই মরদেহ উদ্ধারের ধরন এবং সময়ের ব্যবধান মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করলেও এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে পুলিশি তদন্ত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত দুটি মৃত্যুর মধ্যে কোনো সরাসরি অপরাধমূলক যোগসূত্রের কথা নিশ্চিত করা হয়নি। প্রান্তের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল। একইভাবে তাঁর বাবা পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর মৃত্যুর ক্ষেত্রেও প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক ধারণা এবং তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত কারণ এক বিষয় নয়—এ কারণে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো থেকে বিরত থাকার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে পরপর দুটি মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারটির স্বজনদের মধ্যে গভীর শোক বিরাজ করছে। স্থানীয় পর্যায়েও ঘটনাটি নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে একজন তরুণ চিকিৎসক এবং তাঁর বাবার মৃত্যু একটি পরিবারের ওপর শোকের যে গভীর ছাপ ফেলেছে, তা সহজে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী ছিল এবং ৭ সেপ্টেম্বর প্রান্তের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে কী তথ্য পাওয়া যায়। দুটি ঘটনার বিষয়ে আইনগত ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত গুজব বা অনুমানের বদলে তদন্ত-নির্ভর তথ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়াই জরুরি।
বাবা-ছেলের এই অল্প সময়ের ব্যবধানে মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়, একই সঙ্গে দুটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে যথাযথ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে এনেছে। স্বজন ও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করবে এবং প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হলে তা যথাযথভাবে জানানো হবে।


