প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধান হিসেবে তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, তারেক রহমানকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তিনি কীভাবে ক্ষমতা থেকে সরে যাবেন। হেলিকপ্টারে দেশ ছাড়বেন, নাকি পদত্যাগ করে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেবেন—সেটি তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ১১ দলীয় রাজনৈতিক ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। ওই সমাবেশ থেকেই রংপুরের উদ্দেশে লংমার্চ শুরু হয়। কর্মসূচিতে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।
নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের পদত্যাগের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এরশাদ একসময় পদত্যাগ করেছিলেন। একইভাবে তারেক রহমানকেও নিজের জন্য ক্ষমতা থেকে যাওয়ার পথ বেছে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের এই অংশটি ছিল চলমান রাজনৈতিক আন্দোলন ও সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী জোটের অবস্থানেরই প্রতিফলন।
সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বিএনপি সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে একাধিক অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, বিএনপি সরকারে আসার পর জনগণের অধিকার হরণ করছে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অতীতে যারা গণতন্ত্র ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত ছিল, ইতিহাসে তাদের পরিণতি ভালো হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের দায়িত্ব যেখানে মানুষের মানবাধিকার সুরক্ষা দেওয়া, সেখানে বর্তমান সরকার এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা তাঁর ভাষায় মানবাধিকার হরণের পথ তৈরি করছে। এ সময় তিনি আগের সরকারের সময় ব্যবহৃত বিভিন্ন আইন ও প্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করেন।
নাহিদ ইসলামের দাবি, শেখ হাসিনা সরকারের সময় জনগণের অধিকার হরণের কাজে যেসব আইন ও প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের অভিযোগ ছিল, বর্তমান সরকারও সেগুলো ব্যবহার করতে শুরু করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার পরিবর্তনের পরও জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি।
সমাবেশে তিনি সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে পাস হওয়া বিভিন্ন আইন ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্যে গুম ও মানবাধিকারসংক্রান্ত আইন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামো পরিবর্তনের বিষয় উঠে আসে। এসব বিষয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া যায় তাঁর বক্তব্যে।
তবে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ এবং এর রাজনৈতিক তাৎপর্য। তিনি দাবি করেন, রংপুরমুখী লংমার্চকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, কর্মসূচির পথে ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে।
তাঁর অভিযোগ, শুক্রবার রাত থেকেই বিভিন্ন স্থানে লংমার্চের ব্যানার ও ফেস্টুন সরিয়ে ফেলার ঘটনা ঘটছে। এ কাজে বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের লোকজনও যুক্ত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। তবে এই ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে লংমার্চ বা রাজনৈতিক কর্মসূচির জনসম্পৃক্ততা থামানো যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে মানুষের অংশগ্রহণ ঠেকানো সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনের কর্মসূচি সামনে আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং বিরোধী জোটের বিভিন্ন দাবির পরিধিও ক্রমে বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত এসব দাবি একটি অভিন্ন দাবিতে পরিণত হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ পরিস্থিতিতে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীদের পরবর্তী কর্মসূচির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর বক্তব্যে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সংগঠন ও কর্মসূচি জোরদারের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।
শনিবারের উদ্বোধনী সমাবেশে সভাপতিত্ব ও সমাপনী বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সমাবেশটি সঞ্চালনা করেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
সমাবেশে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া ১১ দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন শরিক দলের নেতারাও সমাবেশে বক্তব্য দেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দামসহ জোটের নেতারা।
১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবেই ঢাকা থেকে রংপুরের উদ্দেশে এই লংমার্চ শুরু হয়েছে। শনিবার সকাল ৭টার দিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে লংমার্চ যাত্রা শুরু করে। জোটটির ঘোষিত দাবিগুলোর মধ্যে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাইয়ের সহিংসতার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দলীয়করণ বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয় রয়েছে।
এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রামমুখী লংমার্চ কর্মসূচি পালন করার কথা জানিয়েছিল ১১ দলীয় ঐক্য। এরপর পর্যায়ক্রমে খুলনা ও সিলেট বিভাগকেন্দ্রিক কর্মসূচির কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে ঢাকা-রংপুর লংমার্চকে জোটটির ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচির একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধী দলগুলোর মাঠের কর্মসূচি, সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। শনিবারের সমাবেশে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। বিশেষ করে সরকারপ্রধানের ক্ষমতা ছাড়ার পথ নিয়ে তাঁর মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে উত্থাপিত সরকারবিরোধী অভিযোগগুলো তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য হিসেবে এসেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারের পক্ষ থেকে কী ব্যাখ্যা বা প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়, সেটিও রাজনৈতিক বিতর্কের পরবর্তী অংশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকা থেকে রংপুরমুখী লংমার্চের মধ্য দিয়ে ১১ দলীয় ঐক্য তাদের ঘোষিত দাবিগুলোকে মাঠের কর্মসূচিতে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে বিরোধী রাজনীতির পরবর্তী কর্মসূচি কী হয় এবং সরকারের পক্ষ থেকে এসব দাবির বিষয়ে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া আসে, সেদিকেও এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের নজর থাকবে।


