প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটে রাধাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত ইসকনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান পালনের অধিকার রয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের পরিবেশ বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে সিলেট নগরের ইসকন মন্দির প্রাঙ্গণে রাধারাণীর মহাভিষেক শেষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন কয়েস লোদী। রাধাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত দিনব্যাপী ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থী অংশ নেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, প্রত্যেক মানুষ নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবেন—এমন একটি পরিবেশ বাংলাদেশে বিদ্যমান থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, স্ব স্ব ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে কেউ কারও জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না। বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, বিশ্বাস ও ভ্রাতৃত্ববোধ অটুট রাখার মধ্য দিয়েই সমাজকে এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতি কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বিষয় নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন আচরণ ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। সমাজে বসবাসকারী প্রত্যেক মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও অধিকারকে সম্মান করার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।
কয়েস লোদী বলেন, বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষের সমন্বয়ে একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধকে সামনে রেখে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় করার আহ্বান জানান তিনি।
রাধাষ্টমী উপলক্ষে সিলেটের ইসকন মন্দিরে সকাল থেকেই ভক্তদের সমাগম শুরু হয়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী আয়োজনের সূচনা হয়। সকালে ভজন ও কীর্তনের পর রাধারাণীর বিশেষ পূজা-অর্চনা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর আয়োজন করা হয় মহাভিষেক, মহিমা কীর্তন ও ধর্মীয় আলোচনা। এসব আয়োজনে বিভিন্ন বয়সী নারী, পুরুষ ও শিশুরা অংশ নেন।
মন্দির প্রাঙ্গণে দিনভর ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। ভক্তরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি কীর্তন ও প্রার্থনায় সময় কাটান। অনেকে উপবাস পালন করে রাধারাণীর আরাধনায় অংশ নেন। ধর্মীয় আলোচনা পর্বে রাধাষ্টমীর তাৎপর্য ও সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যে এর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসকন বাংলাদেশের সহ-সভাপতি ও ইসকন সিলেটের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ ভক্তি অদ্বৈত নবদ্বীপ স্বামী মহারাজ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইসকন সিলেট ইয়ুথ ফোরামের কো-অর্ডিনেটর দেবামৃত নিতাই দাস ব্রহ্মচারী।
আলোচনা সভায় ইসকন সিলেটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইসকন সিলেট মহানগর নামহট্টের সাবেক সভাপতি আদি অনন্ত দাস অধিকারী, ইসকন সিলেট গৃহস্থ কাউন্সিলের সভাপতি সুমঙ্গল গৌর দাস অধিকারী, ইসকন সিলেট বিভাগীয় কমিটির অফিস ব্যবস্থাপনা বিভাগের সম্পাদক সচ্চিদানন্দ শ্যাম সুন্দর দাস, মন্দিরের কমান্ডার দেবেন্দ্র কেশব দাস ব্রহ্মচারী এবং ইসকন সিলেট মন্দিরের যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক সিদ্ধ মাধব দাসসহ সংশ্লিষ্টরা।
আলোচনা পর্বে বক্তারা রাধাষ্টমীর ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে রাধাষ্টমী একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় তিথি। এই দিনে ভক্তরা রাধারাণীর আরাধনা, পূজা, কীর্তন ও প্রার্থনায় অংশ নেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ভক্তরা এ দিনটিকে বিশেষভাবে পালন করেন এবং বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাধারাণীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
রাধাষ্টমীর আয়োজনকে ঘিরে মন্দির প্রাঙ্গণে শিশুদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অনেক শিশু ধর্মীয় অনুষ্ঠান দেখতে ও কীর্তনে অংশ নিতে আসে। ভক্তদের অনেকে দীর্ঘ সময় মন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থান করেন। ধর্মীয় পরিবেশের পাশাপাশি পরস্পরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উৎসবের সামাজিক আবহও তৈরি হয়।
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে ভক্তরা কীর্তন ও প্রার্থনায় অংশ নেন। মহাভিষেকের সময় মন্দির প্রাঙ্গণে উপস্থিত ভক্তদের মধ্যে বিশেষ আবেগ ও ভক্তির পরিবেশ তৈরি হয়। ধর্মীয় আচার শেষে ভক্তদের মধ্যে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়। এতে দিনব্যাপী আয়োজনে অংশ নেওয়া ভক্ত ও দর্শনার্থীরা অংশ নেন।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ধর্মীয় উৎসবগুলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহাবস্থানের বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসে। সিলেট ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাসের একটি অঞ্চল। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও সামাজিক আয়োজনে মানুষের অংশগ্রহণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতা স্থানীয় সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
অনুষ্ঠানে কয়েস লোদীর বক্তব্যেও সেই সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তিনি মানুষের মধ্যে বিভাজনের পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার এবং অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানোর প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতির প্রসঙ্গ বাংলাদেশের সংবিধান ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্কিত। দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব ও আচার পালন করে আসছেন। এ ধরনের আয়োজনগুলোতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেটের ইসকন মন্দিরে রাধাষ্টমীর এবারের আয়োজনেও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তা গুরুত্ব পেয়েছে। ভক্তদের অংশগ্রহণ, কীর্তন, পূজা-অর্চনা, ধর্মীয় আলোচনা ও মহাপ্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচি শেষ হয়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধ্যাত্মিক চর্চার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলাও তাঁদের বিভিন্ন আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। রাধাষ্টমীর মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান মানুষের নিজস্ব বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের চর্চার সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার ক্ষেত্র তৈরি করে বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন।
দিন শেষে মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যান। তবে আয়োজনের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সম্প্রীতির যে বার্তা তুলে ধরা হয়েছে, তা উপস্থিত মানুষের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সিলেটে রাধাষ্টমীর এই আয়োজন তাই ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।


