প্রকাশ:১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় তিন সন্তানকে বিষপ্রয়োগে হত্যার পর বাবা নিজেও বিষপান করেছেন—এমন অভিযোগ ও প্রাথমিক ধারণাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ভোরে উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের রজনী লাইন গ্রামে হৃদয়বিদারক এ ঘটনা ঘটে। ঘটনায় ১০ বছর বয়সী মাওয়া আক্তার, ৭ বছর বয়সী শামীম মিয়া ও দেড় বছর বয়সী তামিম মিয়ার মৃত্যু হয়েছে। তাদের বাবা শরাফত আলীকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শরাফত আলী পেশায় দিনমজুর। তাঁর স্ত্রী চার দিন আগে শ্রমিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দিয়েছেন। এরপর থেকে তিন সন্তানকে নিয়ে নিজ বাড়িতে ছিলেন তিনি। বাড়িতে আর কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য না থাকায় সন্তানদের রেখে বাইরে যাওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এই অবস্থায় শনিবার ভোরে বাড়ি থেকে শিশুদের গোঙ্গানির শব্দ শুনতে পান প্রতিবেশীরা। পরে স্বজন ও স্থানীয় কয়েকজন দ্রুত সেখানে ছুটে যান।
প্রতিবেশীরা বাড়িতে গিয়ে শরাফত আলী ও তাঁর তিন সন্তানকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পান। পরে তাঁদের দ্রুত বাদাঘাট বাজারের একটি বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা করে তিন শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় থাকা শরাফত আলীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জামাল মিয়া জানান, শরাফত আলী দিনমজুরের কাজ করেন। তাঁর স্ত্রী কয়েক দিন আগে বিদেশে চলে যাওয়ার পর তিনি তিন সন্তানকে নিয়ে বাড়িতে ছিলেন। শুক্রবার রাতের শেষ দিকে তাঁদের বাড়ি থেকে গোঙ্গানির শব্দ শুনতে পান প্রতিবেশীরা। পরে স্বজনদের সহায়তায় তাঁদের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। একই পরিবারের তিন শিশুর একসঙ্গে মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও বিষণ্নতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মাওয়া, শামীম ও তামিমের মতো অল্প বয়সী তিন শিশুর আকস্মিক মৃত্যু গ্রামবাসীকে নাড়া দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হারুন মিয়া বলেন, শরাফত আলীর স্ত্রী প্রবাসে থাকেন। তিন সন্তানকে নিয়ে শরাফত বাড়িতে ছিলেন। পারিবারিক কোনো বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়েছিল কি না, তা স্থানীয়ভাবে আলোচনা হচ্ছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের কেউ কেউ ধারণা করছেন, স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কোনো বিষয়ে বিরোধ বা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের কারণে এমন ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে পুলিশও এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো কারণ নিশ্চিত করেনি।
বাদাঘাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ হোসাইন মোহাম্মদ আরাফাত জানান, ভোরে খবর পাওয়ার পর পুলিশ বাদাঘাট বাজারের ডা. হাফিজ উদ্দিন কমপ্লেক্সে যায়। সেখানে তিন শিশুকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁদের বাবা শরাফত আলীকে এরই মধ্যে স্বজনেরা সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুদের মৃত্যুর কারণ বা বিস্তারিত পরিচয় সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, তিন শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হচ্ছে। ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, শিশুদের কীভাবে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং তাঁদের বাবা শরাফত আলী নিজে বিষপান করেছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশ ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। পাশাপাশি শরাফত আলীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে তাঁর কাছ থেকেও ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
প্রাথমিকভাবে স্থানীয়দের মধ্যে যে তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে রাতের কোনো একসময় শিশুদের বিষাক্ত কোনো পদার্থ খাওয়ানো হয়ে থাকতে পারে। পরে শরাফত আলীও একই ধরনের বিষপান করে থাকতে পারেন। তবে এটি এখনো তদন্তসাপেক্ষ বিষয়। ময়নাতদন্ত, চিকিৎসা প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
ঘটনার পেছনে পারিবারিক কোনো বিরোধ ছিল কি না, কিংবা অন্য কোনো কারণ জড়িত ছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনাটি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যার চেষ্টা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শরাফত আলী সাধারণত দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। স্ত্রী বিদেশে যাওয়ার পর অল্প বয়সী তিন সন্তানকে নিয়ে তিনি বাড়িতে ছিলেন। পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক বাস্তবতা, সন্তানদের দেখাশোনা এবং স্ত্রীর অনুপস্থিতির মতো বিষয়গুলো তাঁর ওপর কোনো ধরনের চাপ তৈরি করেছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এসব বিষয় তদন্তে উঠে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই পরিবারের তিন শিশুর মৃত্যুতে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। মাওয়া আক্তার ছিল পরিবারের বড় সন্তান। তার বয়স মাত্র ১০ বছর। শামীম মিয়ার বয়স ৭ বছর এবং সবচেয়ে ছোট তামিমের বয়স ছিল মাত্র দেড় বছর। এত অল্প বয়সে তিন শিশুর জীবন থেমে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারাও শোকাহত।
এদিকে শরাফত আলীর স্ত্রী বর্তমানে দেশের বাইরে থাকায় তাঁর কাছে এই মর্মান্তিক খবর কীভাবে পৌঁছেছে এবং তিনি কখন দেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানা যায়নি। স্বজনদের জন্যও পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। একদিকে তিন শিশুর মৃত্যু, অন্যদিকে তাঁদের বাবার সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা—সব মিলিয়ে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারও বক্তব্য বা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কোনো ধারণার ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে না। তদন্তে যদি কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত একটি গ্রামে একই পরিবারের তিন শিশুর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু তাই শুধু স্বজনদের নয়, পুরো এলাকার মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলে তার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার দাবি উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে। এখন তদন্ত ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন সামনে আসার অপেক্ষা। এর পরই পরিষ্কার হবে, কী ঘটেছিল সেই রাতে এবং কীভাবে একই পরিবারের তিনটি শিশুর জীবন অকালে ঝরে গেল।


