প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ছাত্র উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। তিনি দাবি করেছেন, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করা হলে সাবেক সরকারের প্রত্যেক ছাত্র উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অন্তত শতকোটি টাকার দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে।
শুক্রবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে গণঅধিকার পরিষদ, মহানগর দক্ষিণের কর্মীসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব অভিযোগ করেন। এ সময় তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠন এবং ছাত্র উপদেষ্টাদের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন।
নুরুল হক নুর বলেন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ছাত্র উপদেষ্টাদের বিষয়ে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তার দাবি, শুধু একজন বা দুজন নয়, ওই সময়ে দায়িত্ব পালন করা প্রত্যেক ছাত্র উপদেষ্টার কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা হলে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসবে।
তিনি বলেন, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রত্যেক ছাত্র উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অন্তত শতকোটি টাকার দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে। তবে তার এই বক্তব্যের পক্ষে সভায় কোনো নির্দিষ্ট নথি বা তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
বক্তব্যে নুরুল হক নুর জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, ওই সময় দেশের মানুষের মধ্যে যে ব্যাপক ঐক্য ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ধরে রেখে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ এবং ছাত্র উপদেষ্টাদের ভূমিকার কারণে সেই সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
নুরুল হক নুরের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের আন্দোলনের পর দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে দল-মতনির্বিশেষে যে সমর্থন ও ঐক্য তৈরি হয়েছিল, সেটি ছিল অভূতপূর্ব। এই ঐক্যকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কার, প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক পরিবেশকে স্থিতিশীল করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি আরও অভিযোগ করেন, গণঅভ্যুত্থানের পর যেসব তরুণ বিভিন্ন পর্যায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, তাদের একটি অংশ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। তার দাবি, গণমাধ্যমের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠা কিছু ছাত্র উপদেষ্টা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও প্রশাসনিক কাঠামো ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার আড়ালে ওই ব্যক্তিরা এমন কিছু কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন, যা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। পাশাপাশি বিভিন্ন সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের আঁতাতের অভিযোগও করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টাদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে নুরুল হক নুরের বক্তব্যকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
কর্মীসভায় নুরুল হক নুর বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের অন্যতম বড় প্রত্যাশা ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তরুণদের নেতৃত্বে রাষ্ট্রের সংস্কার ও নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের যে আশা সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার জন্য তিনি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়ী করেন।
তার মতে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থের কারণে সেই ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতি রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করেছে।
নুরুল হক নুরের বক্তব্যে ক্ষমতার জবাবদিহির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি আন্দোলন বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেই তার কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি সাবেক ছাত্র উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকৃত ঘটনা জানতে হলে রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত অবস্থান বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তদন্তে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এ ধরনের অভিযোগের গুরুত্ব রয়েছে মূলত রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহির প্রশ্নে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে তাকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। সুষ্ঠু তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণদের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছিল। আন্দোলনে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের সম্পৃক্ততা নতুন প্রত্যাশার জন্ম দেয়। সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কতটা সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো নানা মত রয়েছে।
নুরুল হক নুরের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ একটি গুরুতর বিষয় হিসেবে আলোচনায় এসেছে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তের প্রয়োজনীয়তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গণঅধিকার পরিষদের এই কর্মীসভায় দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে নুরুল হক নুর দলের রাজনৈতিক অবস্থান, বর্তমান পরিস্থিতি এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে তার মতামত তুলে ধরেন। তিনি তরুণদের প্রত্যাশা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সবশেষে নুরুল হক নুর বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তার মতে, অতীতে যারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের কর্মকাণ্ডও প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যালোচনা করা উচিত। বিশেষ করে ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তদন্ত করতে হবে।
তবে ছাত্র উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে তার উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীন কোনো তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সময়ে কোনো তদন্ত বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য সামনে আসে কি না, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের।

