প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনা করছে বর্তমান সরকার। এসব চুক্তির কোনোটিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয় রয়েছে কি না, তা যাচাই করে শিগগিরই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে দুই দেশের সম্পর্ক, বিভিন্ন চুক্তি, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম, ব্রিকস সম্মেলন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এবং সংসদের সাম্প্রতিক কার্যক্রম নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন চিফ হুইপ।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে সেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার নামে দেশের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
চিফ হুইপের বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে যেসব চুক্তি করা হয়েছিল, সেগুলো বর্তমান সরকার খতিয়ে দেখছে। পর্যালোচনার মাধ্যমে কোনো চুক্তি বা ব্যবস্থায় দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো বিষয় পাওয়া গেলে সেটি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে কোন কোন চুক্তির কোন ধারায় আপত্তি রয়েছে, সে বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেন চিফ হুইপ। তার বক্তব্যে উঠে আসে, একটি দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তখনই টেকসই হয়, যখন উভয় দেশের স্বার্থ ও মর্যাদা সমানভাবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও সেই ভারসাম্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে নুরুল ইসলাম মনি আগের সরকারের সময়ে করা বিভিন্ন ব্যবস্থা ও চুক্তির সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, একই সময়ে বাংলাদেশ ও কোনো বন্ধুদেশের দুটি জাহাজ বন্দরে এলে বন্ধুদেশের জাহাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে খালাস করার মতো ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তার মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে সেগুলো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমান সরকার দেশের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করা বিভিন্ন চুক্তি ও ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট চুক্তির আইনগত, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া হয়নি।
এদিকে ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত আমন্ত্রণ না জানানোর বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি এর আগে আলোচনায় এলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ অংশ নিচ্ছে না বলে তিনি জানান।
চিফ হুইপের বক্তব্যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে পারস্পরিক মর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি সামনে এসেছে। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, সীমান্ত, পানি, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে পুরোনো চুক্তিগুলোর পর্যালোচনার উদ্যোগ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের কার্যক্রমের বিভিন্ন দিকও তুলে ধরেন চিফ হুইপ। তিনি জানান, নয় কার্যদিবসের এই অধিবেশনে মোট ছয়টি বিল পাস হয়েছে। সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি আইন প্রণয়ন ও সংসদীয় কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে।
তিনি জানান, অধিবেশনে মোট ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নোত্তর হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সংসদীয় কার্যক্রমে প্রশ্নোত্তর পর্বকে সরকারের জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। ফলে অধিবেশনে বিপুলসংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে গুরুত্ব পায়।
সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত একটি বিল নিয়েও কথা বলেন নুরুল ইসলাম মনি। তিনি জানান, নতুন ব্যবস্থায় বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানকে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করলেও তাদের সেই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি রাখা হয়েছে। তার মতে, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জীবনের শেষ সময়ে সম্পত্তির ওপর তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এই বিলের বিরোধিতা করে বিরোধী দলের নেতারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করায় সরকারি দলের সদস্যরা মর্মাহত হয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার মতো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মতবিরোধ তৈরি হওয়া দুঃখজনক।
বিদ্যুৎ সংকট নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, নতুন একটি ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে বড় পরিবর্তন আনা সহজ নয়। বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে সময় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এগোতে হচ্ছে বলে তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
আগের সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার মাধ্যমে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন নুরুল ইসলাম মনি। তার মতে, বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন চুক্তি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার কারণে রাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকার এসব বিষয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করছে বলে তিনি জানান।
চিফ হুইপ আরও বলেন, বর্তমান সরকার আগের সরকারের সময়কার দায়মুক্তির ব্যবস্থা বাতিল করেছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
সব মিলিয়ে সংসদ অধিবেশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপের বক্তব্যে সরকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের বিষয় উঠে এসেছে। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে পুরোনো চুক্তিগুলো পর্যালোচনা, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পরিচালনা, বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন এবং সংসদীয় কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়গুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার উদ্যোগ বাস্তবে কী ধরনের সিদ্ধান্তে গড়ায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কোনো চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বিষয় চিহ্নিত হলে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেটিও পর্যবেক্ষণে থাকবে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে সরকার কী ধরনের ভারসাম্য তৈরি করতে পারে, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে।
সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে অবস্থান জানানো হয়েছে, তার বাস্তব প্রয়োগই শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে। চুক্তিগুলো পর্যালোচনার পর সুনির্দিষ্ট তথ্য ও সিদ্ধান্ত সামনে এলে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ সম্পর্কেও আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।


