প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জীবনের শেষ সময়ে তাদের সম্পদ ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের বিরোধিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেছেন, বাবা-মায়ের কাছ থেকে সম্পত্তি নেওয়ার পর তাদের অসহায় অবস্থায় ফেলে দেওয়ার সুযোগ কোনোভাবেই থাকা উচিত নয়। এই পরিস্থিতি ঠেকাতেই নতুন আইনি সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে বিরোধী দলের নেতাদের আপত্তির বিষয়ে কথা বলেন চিফ হুইপ। তার বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে বিলটির সঙ্গে শরিয়া আইন ও মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সম্পর্ক নিয়ে চলমান বিতর্ক।
চিফ হুইপের ভাষ্য, সম্পত্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত সংশোধিত আইনে শরিয়া আইন চালু করার কোনো বিষয় নেই। অথচ শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে একটি অংশ বিলটির বিরোধিতা করছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি কোনো একটি আইনের ক্ষেত্রে শরিয়া আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রশ্ন তোলা হয়, তাহলে দেশে প্রচলিত অন্যান্য আইন নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন উঠতে পারে কি না।
তার মতে, বিলটির মূল উদ্দেশ্য উত্তরাধিকার নির্ধারণ করা নয়; বরং বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থায় সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর যাতে তারা নিজেদের সম্পদের ব্যবহার থেকে বঞ্চিত না হন, সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে জীবনের শেষ পর্যায়ে বাবা-মায়ের আর্থিক নিরাপত্তা যেন অন্যের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সংশোধিত আকারে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬ পাস হয়। সংশোধিত বিধানের আওতায় দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগস্বত্ব সংরক্ষণের সুযোগ রেখে সন্তান, নাতি-নাতনি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আইনটির পক্ষে যুক্তি হলো, কোনো বাবা বা মা জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি সন্তানকে দান বা হস্তান্তর করলেও তিনি যেন সেই সম্পত্তির ভোগদখল ও প্রয়োজনীয় ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত না হন।
তবে বিলটি নিয়ে বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আইনটি শরিয়া ও মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা স্পষ্টভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে ইসলামী আইন ও শরিয়া বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে। ফলে বিলটি পাস হওয়ার পরও এর ধর্মীয় ও আইনগত ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
এই আপত্তির জবাবে চিফ হুইপ বলেন, বিলের কোথাও শরিয়া আইন প্রবর্তনের কথা বলা হয়নি। তাই শরিয়া আইন চালু হওয়ার আশঙ্কা দেখিয়ে বিলের বিরোধিতা করার যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, আইনটির বক্তব্য ও উদ্দেশ্য ভালোভাবে পড়লে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার কথা।
সম্পত্তি হস্তান্তরের পর অসহায় হয়ে পড়া বৃদ্ধ বাবা-মায়ের বাস্তব পরিস্থিতির কথাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে সেই বাবা-মাকে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়, কখনো ভিক্ষাবৃত্তির মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, আবার কখনো বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে হয়। এই ধরনের মানবিক সংকট প্রতিরোধ করাই আইনের অন্যতম লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চিফ হুইপ বলেন, সন্তানদের কাছে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার পর বাবা-মাকে যদি জীবনের শেষ সময়ে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাতে হয়, তাহলে সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব কেবল সামাজিক বা নৈতিক বিষয় নয়, তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের ভূমিকা থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, মা-বাবাকে সম্মান করা এবং তাদের জীবদ্দশায় নিজেদের সম্পদ ভোগ করার অধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন বাবা কিংবা মা নিজের জীবনের সঞ্চয়, জমি বা অন্য সম্পদ সন্তানদের মধ্যে হস্তান্তর করার পরও যেন নিজের জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় অবলম্বন ধরে রাখতে পারেন, নতুন আইনি ব্যবস্থায় সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ সময় প্রচলিত আইনব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন চিফ হুইপ। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে ফৌজদারি আইনসহ বিভিন্ন ধরনের আইন প্রচলিত রয়েছে, যেগুলো সরাসরি শরিয়া আইনের ভিত্তিতে তৈরি নয়। ফলে একটি নির্দিষ্ট আইনের ক্ষেত্রে শরিয়া আইনের প্রসঙ্গ তুলে আপত্তি জানালে প্রচলিত অন্যান্য আইন নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন তোলা সম্ভব। তার মতে, আইনটির উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা বুঝে বিষয়টি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ধর্মীয় দলগুলোর আপত্তির প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনায় ৩৩টি দল অংশ নিয়েছে। কোনো একটি দল বা ব্যক্তি নিজেকে ইসলামি দলের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়ে কোনো বক্তব্য দিলে সেটিকে সব ইসলামি দলের অভিন্ন বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থানের ক্ষেত্রে ভিন্ন দল ও ব্যক্তির ভিন্ন মত থাকতে পারে।
সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের কার্যক্রমের বিভিন্ন দিকও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন চিফ হুইপ। তিনি জানান, নয় কার্যদিবসের এই অধিবেশনে মোট ছয়টি বিল উত্থাপিত হয়েছে এবং ছয়টি বিল পাস হয়েছে। অধিবেশনে কার্যপ্রণালি-বিধির বিভিন্ন বিধির আওতায় একাধিক নোটিশের ওপর আলোচনা হয়েছে।
চিফ হুইপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কার্যপ্রণালি-বিধির ৬৮ বিধিতে দুটি নোটিশের ওপর আলোচনা হয়েছে। ৭১ বিধিতে ১৪টি নোটিশ নিয়ে আলোচনা হয়। একই বিধির আরেক পর্যায়ে প্রায় ১২৪টি নোটিশের ওপর আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া ১৪৭ বিধিতে একটি এবং ৩০২ বিধিতে একটি নোটিশ উত্থাপিত হয়েছে।
অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বেও উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম হয়েছে বলে জানান তিনি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ১৫টি প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিয়েছেন এবং পুরো অধিবেশনে মোট ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নোত্তর হয়েছে।
তবে সম্পত্তি হস্তান্তর বিলকে ঘিরে মূল বিতর্কটি এখন বাবা-মায়ের অধিকার, সম্পত্তির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ এবং ধর্মীয় আইনের সঙ্গে প্রচলিত আইনের সামঞ্জস্যের প্রশ্নে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে আইনটির সমর্থকেরা বলছেন, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জীবনের শেষ সময়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ধরনের আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন। অন্যদিকে বিরোধিতাকারীরা আইনটি মুসলিম উত্তরাধিকার ও শরিয়া বিধানের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্টতা চান।
বাংলাদেশের পারিবারিক বাস্তবতায় সম্পত্তি হস্তান্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জীবিত অবস্থায় সন্তানদের মধ্যে সম্পদ ভাগ করে দেওয়া বা দান করার পর অনেক বাবা-মা নিজেদের আর্থিক নিরাপত্তা হারিয়ে ফেলেন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে চিকিৎসা, খাদ্য, বাসস্থান ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে অর্থের প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়। সে সময়ে নিজের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে একজন বৃদ্ধ মানুষের জীবন দ্রুত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দাতার জীবনকাল পর্যন্ত ভোগস্বত্ব সংরক্ষণের বিধানকে অনেকে সামাজিক সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে আইনটির প্রয়োগ যেন ধর্মীয় বিধান, উত্তরাধিকার আইন এবং বিদ্যমান সম্পত্তি আইনের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিফ হুইপের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সরকার বা আইনটির সমর্থকেরা এটিকে মূলত বাবা-মায়ের জীবনের শেষ সময়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে এর ধর্মীয় ও আইনগত দিক নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা আরও আলোচনার মাধ্যমে পরিষ্কার করার প্রয়োজন রয়েছে। শেষ পর্যন্ত আইনটি বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং বাবা-মায়ের সম্পত্তি ও ভোগস্বত্ব কতটা কার্যকরভাবে সুরক্ষিত হবে, সেটিই হবে এর সাফল্যের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি।


