প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজার কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ওমান। এর মধ্যে পাঁচ হাজার কৃষি শ্রমিক এবং পাঁচ হাজার মৎস্য শ্রমিক নেওয়ার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ওমানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও নতুন এই উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ওমানের শ্রমবাজার আরও উন্মুক্ত করার বিষয়ে দুই দেশ কাজ করছে।
বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে ওমানের রাজপরিবারের সদস্য আল সাইয়্যেদ মোহাম্মদ সেলিম আলী আল সাইদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করে। বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ওমানের শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজার কর্মী নেওয়ার বিষয়ে ওমানের আগ্রহের কথা জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ওমানের কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ওমানের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলেছে। প্রাথমিকভাবে পাঁচ হাজার কৃষি শ্রমিক এবং পাঁচ হাজার মৎস্য শ্রমিক নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সব মিলিয়ে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং এ বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে বলেও তিনি জানান।
তবে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়নি। বাংলাদেশে ওমানের আরেকটি প্রতিনিধিদল আগামী মাসে আসার কথা রয়েছে। ওই প্রতিনিধিদল প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করবে। পরবর্তী আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে কর্মী নিয়োগের বিষয়গুলো চূড়ান্ত হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
বাংলাদেশের জন্য ওমানের শ্রমবাজার বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। নতুন করে কৃষি ও মৎস্য খাতে কর্মী নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য নতুন একটি পথ খুলতে পারে।
বিশেষ করে কৃষি ও মৎস্য খাত বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। দেশের গ্রাম ও উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক মানুষ এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তাদের মধ্য থেকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জনকারী কর্মীরা বিদেশে কাজের সুযোগ পেলে একদিকে যেমন পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হতে পারে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে কর্মীদের দক্ষতা, নিরাপত্তা, নিয়োগের স্বচ্ছতা এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকারও এখন দক্ষ অভিবাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন শামা ওবায়েদ ইসলাম।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ দক্ষ অভিবাসনের ওপর জোর দিচ্ছে এবং বিষয়টি ওমান সরকারের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও বেশি দক্ষ মানুষকে ওমানে পাঠানোর আগ্রহ রয়েছে। তারা যেন বিভিন্ন খাতে কাজ করার সুযোগ পান, সে বিষয়ে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছে। ওমানও এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানান তিনি।
দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষতার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। শুধু শ্রমনির্ভর কাজের পরিবর্তে প্রযুক্তি, কৃষি ব্যবস্থাপনা, মৎস্যচাষ, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত কর্মীদের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ যদি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মীদের প্রস্তুত করতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ওমানে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমানে বিভিন্ন কারণে ওমানের ভিসা ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বিভিন্ন কারণে ওমানের ভিসা বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে যাতে বাংলাদেশিরা নিয়মিতভাবে ওমানে যেতে পারেন, সে বিষয়ে চেষ্টা করছে। নতুন কর্মী নিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় ভিসা ও শ্রমবাজারসংক্রান্ত বিষয়গুলোও দ্রুত সমাধানের প্রয়োজন রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বৈঠকে বাংলাদেশ ও ওমানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারের বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ওমানের শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে শ্রমবাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
বৈঠকে ওমানের রাজপরিবারের সদস্য আল সাইয়্যেদ মোহাম্মদ সেলিম আলী আল সাইদ ওমানের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবদানের প্রশংসা করেন। তিনি দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিকভাবে লাভজনক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির পাশাপাশি এ ধরনের উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্ককেও আরও গভীর করতে পারে। শ্রমবাজারের বাইরে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, কৃষি, মৎস্য ও অন্যান্য অর্থনৈতিক খাতেও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ ওমানের অর্থনীতিতে দক্ষ ও পরিশ্রমী কর্মীদের অবদান আরও বাড়াতে পারলে দুই দেশই এর সুফল পেতে পারে।
তবে সম্ভাব্য ১০ হাজার কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিদেশে যাওয়ার সময় কর্মীদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়মের ঝুঁকিতে পড়েন। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, চাকরির শর্ত সম্পর্কে অস্পষ্টতা কিংবা নিয়োগকর্তার প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য কর্মীদের জন্য বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই সরকারি তদারকির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা এবং কর্মীদের চুক্তির শর্ত সম্পর্কে আগেই স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে যারা কৃষি ও মৎস্য খাতে ওমানে যাওয়ার সুযোগ পাবেন, তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও ভাষাগত প্রস্তুতি দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কাজের পরিবেশ, শ্রম আইন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্পর্কে কর্মীদের ধারণা থাকলে বিদেশে গিয়ে তাদের বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।
আগামী মাসে ওমানের প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর তাই এই প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার পর কর্মী নির্বাচনের পদ্ধতি, নিয়োগের শর্ত, ভিসা প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থানের খাত এবং অন্যান্য বিষয় আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সবকিছু নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে বাংলাদেশের ১০ হাজার নাগরিকের জন্য ওমানে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ভিসা জটিলতা দূর করে নিয়মিত শ্রমবাজার চালু করা গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বাংলাদেশি কর্মীদের ওমানে যাওয়ার পথ সুগম হতে পারে।
সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হবে সম্ভাব্য এই সুযোগকে একটি টেকসই ও নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া। দক্ষ কর্মী তৈরি, নিয়োগে স্বচ্ছতা, অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা এবং কূটনৈতিকভাবে ভিসা জটিলতা সমাধান—সবগুলো বিষয় সমান গুরুত্ব পেলে ওমানের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

