প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন পুলিশকে কোনো বেআইনি নির্দেশনা দেবে না বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ. এম. এম. নাসির উদ্দিন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের আস্থা রয়েছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ অডিটরিয়ামে ‘নির্বাচনি দায়িত্ব পেশাদারিত্বের সঙ্গে সম্পাদনের লক্ষ্যে পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। নির্বাচনের মাঠে পুলিশের দায়িত্ব কী হবে, কীভাবে আইন ও বিধি অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং ভোটকেন্দ্র ও ভোটারদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয় এ ধরনের প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশিক্ষণ উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে কমিশন পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের যেমন সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি পুলিশেরও সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব রয়েছে।
তিনি বলেন, কমিশনের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে কোনো বেআইনি নির্দেশনা যাবে না। পুলিশও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য কাজ করার বিষয়ে তাদের অবস্থান জানিয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এই বক্তব্য নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইন ও সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সামনে এনেছে। নির্বাচন পরিচালনার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা এবং নির্বাচনী অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের দায়িত্ব রয়েছে।
স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীদের সঙ্গে ভোটারদের সরাসরি সম্পর্ক থাকায় নির্বাচনী পরিবেশ কখনো কখনো উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের সময়কার পরিস্থিতির তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি খারাপ নয়। এ সময় তিনি পুলিশের ওপর কমিশনের আস্থার কথাও জানান।
তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে কমিশন স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে বড় ধরনের বাধা হিসেবে দেখছে না বলে ধারণা পাওয়া যায়। তবে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হবে বলেও সংশ্লিষ্ট মহলের বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
নির্বাচনে পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন করা হয় অনুষ্ঠানে। বিশেষ করে দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় পুলিশ চাপমুক্তভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে পারবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হাসান ফকির বলেন, বর্তমানে দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকলেও এটি একটি গণতান্ত্রিক সরকার। নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর করার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করা হবে।
আইজিপির এই বক্তব্যে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা এবং পুলিশের আইনগত দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো ধরনের চাপের বাইরে থেকে আইন অনুযায়ী কাজ করার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা, প্রার্থীদের প্রচারণা, নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়ন, সংঘাত প্রতিরোধ এবং ভোটারদের নিরাপদে কেন্দ্রে যাওয়া-আসার পরিবেশ তৈরিতে পুলিশের দায়িত্ব রয়েছে। ফলে স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে পুলিশের সাম্প্রতিক ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। গত ছয় মাসে পুলিশের ভাবমূর্তি ফেরানোর ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি হয়েছে জানতে চাইলে আইজিপি মো. আলী হাসান ফকির বলেন, তিনি মনে করেন পুলিশের সাফল্য শতভাগ।
পুলিশের ভাবমূর্তি, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা নির্বাচনের সময় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ভোটাররা যেন নিরাপদ পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন এবং কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা চাপ ছাড়াই নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অন্যতম শর্ত। এ ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের আচরণ ও পেশাদারিত্ব সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
স্থানীয় নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় পরিসরে ছোট হলেও এর প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি পড়ে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ বা অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধিরা মানুষের নাগরিক সেবা, স্থানীয় উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকেন। তাই স্থানীয় পর্যায়ে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন স্থানীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বেআইনি নির্দেশনা না দেওয়ার ঘোষণা এবং পুলিশের পক্ষ থেকে কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের বক্তব্য—দুই পক্ষের এই অবস্থান এখন মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই মূল বিষয়। কারণ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে না; বরং ভোটকেন্দ্র, প্রার্থী, ভোটার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বাস্তব ব্যবস্থাপনার ওপরও তা নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক সংস্থার কাজের সীমা ও আইনগত ক্ষমতা স্পষ্ট থাকা জরুরি। কোনো ধরনের বেআইনি নির্দেশনা বা রাজনৈতিক প্রভাব নির্বাচনী পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বিপরীতে আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করলে ভোটারদের আস্থা বাড়ে এবং নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।
স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে পুলিশের জন্য শুরু হওয়া প্রশিক্ষণ তাই শুধু দক্ষতা বাড়ানোর কর্মসূচি নয়, বরং নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে আইন, পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার বিষয়টিকেও সামনে আনছে। নির্বাচন কমিশন এবং পুলিশ উভয় পক্ষের বক্তব্যে যে প্রতিশ্রুতির কথা উঠে এসেছে, তার বাস্তব প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে দেখা যাবে নির্বাচনের সময়।
শেষ পর্যন্ত স্থানীয় নির্বাচনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সাধারণ ভোটারের জন্য নিরাপদ ও নির্ভয় পরিবেশ তৈরি করা। ভোটার যেন কোনো চাপ, ভয় বা বাধা ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী ভোট দিতে পারেন—এটাই একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মূল ভিত্তি। নির্বাচন কমিশন ও পুলিশের সাম্প্রতিক অবস্থান সেই লক্ষ্য পূরণে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে সবার।


