প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরের শাহজালাল উপশহর এলাকায় এক কিশোরীর কোমরে শিকল বেঁধে রাস্তায় হাঁটানোর অভিযোগে তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেওয়ার পর মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
আটক তিনজন হলেন শাহজালাল উপশহর এলাকার সি ব্লকের ৪৪ নম্বর রোডের ৫১ নম্বর বাসার মৃত জালাল উদ্দিনের দুই ছেলে মো. জাকির হোসেন (৪৩) ও মো. মোজাক্কির হোসেন (৪০) এবং একই এলাকার ৫৪ নম্বর বাসার মো. মজিবুর রহমানের ছেলে মো. বুরহান উদ্দিন (৪৫)।
পুলিশ জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে তাদের শনাক্ত করার পর আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে আদালতে সোপর্দ করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনির হোসেনও জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত সোমবার রাতের দিকে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, সিলেট নগরের শাহজালাল উপশহরের ডি-ব্লক মসজিদ মার্কেট এলাকায় একটি দোকানের ক্যাশ বাক্স চুরির চেষ্টা করার অভিযোগে ১৬ বছর বয়সী ওই কিশোরীকে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কয়েকজন ব্যক্তি আটক করেন। পরে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে স্থানীয়ভাবে তাকে আটকের পর পুলিশের কাছে দেওয়ার আগে তার সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছিল, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, এক কিশোরীর কোমরে শিকল বাঁধা এবং একজন যুবক তাকে শিকল ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। ভিডিওতে কিশোরীকে কান্নাকাটি করতে দেখা যায়। তাকে এভাবে বেশ কিছুটা পথ নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সোমবার রাত আনুমানিক ১১টার দিকে উপশহরের ডি-ব্লক মসজিদ মার্কেট এলাকার সড়কে কিশোরীকে শিকল বাঁধা অবস্থায় হাঁটানো হয়। এর আগে সন্ধ্যার দিকে তাকে একটি দোকানের ক্যাশ বাক্স চুরির চেষ্টার অভিযোগে আটক করা হয়েছিল বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি।
তবে অভিযোগটি সত্য কি না, তা তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে চুরি বা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলেই তাকে নিজের হাতে শাস্তি দেওয়ার অধিকার সাধারণ মানুষের নেই। অপরাধের অভিযোগ থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করাই আইনসম্মত পদ্ধতি।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ঘটনার বিষয়ে প্রথমদিকে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা অবগত নন বলে জানিয়েছিলেন। শাহপরান থানার ওসি মো. মনির হোসেন তখন জানিয়েছিলেন, কিশোরীকে শিকল দিয়ে হাঁটানোর বিষয়টি তার জানা নেই। তবে কেউ এমন কাজ করে থাকলে তা অন্যায় হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এরপর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে এবং সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। পুলিশ ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেয়। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার রাতে তিনজনকে আটক করা হয়।
আইনজীবী সুদীপ্ত অর্জুনের বক্তব্য অনুযায়ী, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৯ ধারায় কোনো সাধারণ নাগরিক আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তিকে আটক করতে পারেন। তবে আটকের পর তাকে অনতিবিলম্বে পুলিশের কাছে বা নিকটবর্তী থানায় হস্তান্তর করতে হয়। নিজের হাতে বিচার বা শাস্তি দেওয়ার কোনো সুযোগ আইনে নেই।
আইনজীবীর মতে, কাউকে আটক করার পর তার কোমরে শিকল বেঁধে প্রকাশ্যে হাঁটানো, শারীরিকভাবে আঘাত করা কিংবা মানসিকভাবে অপমান বা নির্যাতন করা আইনসম্মত নয়। এমন আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ঘটনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে কারণ ভুক্তভোগী একজন কিশোরী। কোনো অপরাধে তার সম্পৃক্ততা থাকলেও একজন অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে আইন ও মানবিকতার বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর। জনসমক্ষে অপমান বা শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে বিচার করার কোনো সুযোগ নেই।
একটি অভিযোগের কারণে একজন মানুষকে প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা সমাজে আরও বড় বিপদ তৈরি করতে পারে। কারণ অভিযোগ এবং অপরাধ প্রমাণ এক বিষয় নয়। আইন আদালতের মাধ্যমে অপরাধের সত্যতা যাচাই করার সুযোগ প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কেউ অপরাধী হলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আর অভিযোগ মিথ্যা হলে নিরপরাধ ব্যক্তির সামাজিক ও মানসিক ক্ষতির দায়ও কম নয়।
এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকেই কিশোরীর প্রতি এমন আচরণকে অমানবিক ও আইনবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে নিজের হাতে শাস্তি দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করার দাবি উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয়ভাবে কোনো চুরি, ছিনতাই বা অন্য অপরাধের অভিযোগে কাউকে আটক করার প্রয়োজন হলে দ্রুত পুলিশকে খবর দেওয়া উচিত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে মারধর, অপমান, শিকল পরানো বা প্রকাশ্যে ঘোরানোর মতো পদক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে মূল অপরাধের তদন্ত বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নতুন করে নির্যাতনের অভিযোগও তৈরি হতে পারে।
এখন পুলিশের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে কিশোরীকে কারা আটক করেছিল, তাকে কীভাবে শিকল পরানো হয়েছিল, কারা তাকে রাস্তায় নিয়ে গিয়েছিল এবং ওই ঘটনায় প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয়। ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের চেষ্টা করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশের পক্ষ থেকে তিনজনকে আটক করার ঘটনায় তদন্তের পরবর্তী ধাপ শুরু হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং আদালতে সোপর্দের প্রক্রিয়া শেষ হলে আইনগতভাবে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে এই ঘটনা সমাজের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছে বলে সন্দেহ হলে তাকে শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব সাধারণ মানুষের নয়। আইনের শাসন নিশ্চিত করার জন্য অভিযোগকারী, অভিযুক্ত, ভুক্তভোগী—সবার অধিকার রক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে আইনগত সুরক্ষা এবং মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা আরও জরুরি।
শাহজালাল উপশহরের এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত শুধু তিনজনের আটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তদন্তের মাধ্যমে শিকল পরানোর পুরো ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের ভূমিকাও সামনে আসবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—অপরাধের অভিযোগ থাকলেও কাউকে প্রকাশ্যে অপমান বা নির্যাতন করে বিচার করা কোনো সভ্য ও আইনভিত্তিক সমাজের পথ হতে পারে না। অভিযোগের বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, আর মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়ের।


