প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা শিল্পে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সতর্ক করেছে দেশটির নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা পিইটি। বিশেষ করে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়া এবং দেশটির প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে যুক্ত ড্যানিশ প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। পিইটির ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি এখন আর কেবল একটি দূরবর্তী আশঙ্কা নয়; নাশকতার জন্য লক্ষ্য নির্বাচন ও প্রস্তুতির বিষয়ে তারা নির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। এর আগে ড্যানিশ সংবাদমাধ্যম বার্লিংস্কে ও ডিআরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পিইটির কাউন্টারইন্টেলিজেন্স বিভাগের প্রধান এমিল গ্রেসহোম রুশ তৎপরতার বিষয়ে বিস্তারিত সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রুশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নাশকতার প্রস্তুতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন মনে করছে পিইটি।
পিইটির এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা উত্তেজনা দীর্ঘদিন ধরে বাড়ছে। ইউক্রেনকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী ইউরোপীয় দেশগুলোর অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগও ক্রমশ বাড়ছে।
এমিল গ্রেসহোমের বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সম্ভাব্য নাশকতার অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় সহায়তা দেওয়া সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত করা। এর মাধ্যমে ইউক্রেনের জন্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করার পাশাপাশি ইউরোপীয় সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করার চেষ্টা করা হতে পারে। পিইটি মনে করছে, এমন তৎপরতার আরেকটি উদ্দেশ্য হতে পারে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা।
তবে ড্যানিশ গোয়েন্দা সংস্থার সতর্কবার্তার অর্থ এই নয় যে ডেনমার্কে ইতোমধ্যে রাশিয়ার কোনো নাশকতামূলক হামলা সংঘটিত হয়েছে। পিইটির প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, ডেনমার্কে রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা নির্দিষ্ট কোনো শারীরিক নাশকতা সংঘটিত হওয়ার প্রমাণ তারা বর্তমানে জানে না। বরং গোয়েন্দা সংস্থার উদ্বেগের মূল বিষয় হলো সম্ভাব্য হামলার জন্য লক্ষ্য নির্বাচন, তথ্য সংগ্রহ এবং প্রস্তুতিমূলক তৎপরতা।
রুশ গোয়েন্দা তৎপরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সাধারণ ড্যানিশ নাগরিকদের ব্যবহার করার চেষ্টার কথাও জানিয়েছে পিইটি। গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ছোটখাটো কাজের জন্য আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যে একটি বৃহত্তর গোয়েন্দা বা নাশকতা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন, তা তারা নিজেরাও বুঝতে নাও পারেন।
পিইটির তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের কাজে কোনো কারখানা বা প্রতিষ্ঠানের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করা, প্রবেশপথ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য নেওয়া কিংবা কোনো স্থাপনার আশপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মতো কাজ থাকতে পারে। পরবর্তী সময়ে এসব তথ্য সম্ভাব্য নাশকতার পরিকল্পনায় ব্যবহার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ড্যানিশ গোয়েন্দা সংস্থা।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ নাগরিকদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তি বা সন্দেহজনক কোনো পক্ষ যদি কোনো প্রতিষ্ঠান, কারখানা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছবি, ভিডিও বা নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের অনুরোধ জানায়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ডেনমার্কের ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও এ সতর্কবার্তা গুরুত্ব পেয়েছে। কনফেডারেশন অব ড্যানিশ ইন্ডাস্ট্রির নিরাপত্তা ও জরুরি প্রস্তুতি বিভাগের প্রধান রাসমুস অ্যান্ডারস্কাউ বলেছেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করার আহ্বান জানানো হবে। তার মতে, ড্যানিশ শিল্প খাতের খুব ছোট একটি অংশ সরাসরি এ ধরনের ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে, তবে সম্ভাব্য হুমকিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
প্রতিরক্ষা শিল্পের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডেনমার্কও ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ফলে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো রাশিয়ার সম্ভাব্য চাপ বা নাশকতার লক্ষ্য হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ড্যানিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ফ্লেমিং স্প্লিডসবোয়েল পরিস্থিতিটিকে রাশিয়ার নিরাপত্তা তৎপরতার একটি নতুন ও উন্নত মাত্রা হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহজনক তৎপরতার যে অভিযোগ সামনে এসেছে, ডেনমার্কের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তাও সেই বৃহত্তর নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটের অংশ।
অন্যদিকে সাবেক সামরিক গোয়েন্দা বিশ্লেষক জ্যাকব কার্সবো মনে করেন, ড্যানিশ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এত স্পষ্টভাবে সম্ভাব্য হুমকির কথা প্রকাশ করা একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। তার মতে, এ ধরনের প্রকাশ্য সতর্কবার্তার মাধ্যমে একদিকে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা যায়, অন্যদিকে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকেও বোঝানো যায় যে তাদের তৎপরতা নজরদারির বাইরে নেই।
ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে রাশিয়ার কথিত ‘হাইব্রিড’ কর্মকাণ্ড নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্বেগ বেড়েছে। এর মধ্যে সাইবার হামলা, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং শারীরিক নাশকতার মতো বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। ডেনমার্কের পিইটি আগেও ইউরোপে রাশিয়ার শারীরিক নাশকতার হুমকি বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেনমার্কের কর্তৃপক্ষ প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে। কারখানা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং সন্দেহজনক যোগাযোগ শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডেনমার্কের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু রাখা। অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন হলেও তা যেন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে অযথা বাধাগ্রস্ত না করে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে ডেনমার্কে নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো প্রত্যক্ষ স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি। ফলে পিইটির বক্তব্যকে গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা সতর্কতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা ও সম্ভাব্য পরিকল্পনার পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ্যে না থাকায় বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগও সীমিত।
তবে ড্যানিশ গোয়েন্দা সংস্থার প্রকাশ্য সতর্কবার্তা ইউরোপের চলমান নিরাপত্তা সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়া দেশগুলোর প্রতিরক্ষা শিল্প এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহের কেন্দ্র নয়, বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংঘাতের অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। ডেনমার্কের সাম্প্রতিক সতর্কতা সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
পিইটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভবিষ্যতে হুমকির পরিমাণ ও জটিলতা আরও বাড়তে পারে। তাই সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি, প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা এবং সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা—এই তিন ক্ষেত্রেই সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। এখন ড্যানিশ কর্তৃপক্ষের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সম্ভাব্য হুমকিকে হামলায় রূপ নেওয়ার আগেই শনাক্ত ও প্রতিহত করা।

