প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে পুলিশের হেফাজত থেকে হাতকড়া পরা অবস্থায় এক আসামি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তারের পর হট্টগোলের সুযোগে ওই আসামি পালিয়ে যান। তবে স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের ভাষ্য, স্বজন ও স্থানীয় লোকজনের বাধার মুখে পুলিশ তাকে নিয়ে যেতে না পারায় একপর্যায়ে তিনি হাতকড়াসহ পুলিশের কাছ থেকে সরে যান। পালিয়ে যাওয়ার পর ওই ব্যক্তি হাতকড়া পরা অবস্থায় নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে লাইভে এসে পুলিশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও করেন।
ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের দামোধরতপী পয়েন্ট এলাকায়। পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তির নাম আসির মিয়া। তিনি দামোধরতপী গ্রামের বাসিন্দা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একটি মামলার আসামি হিসেবে আসির মিয়াকে গ্রেপ্তারের জন্য বুধবার রাতে শান্তিগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নুর উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল দামোধরতপী এলাকায় অভিযান চালায়। অভিযানের একপর্যায়ে পুলিশ তাকে আটক করে। পরে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
এ সময় ঘটনাস্থলে আসির মিয়ার স্বজন ও স্থানীয় কয়েকজন লোক জড়ো হন। তাকে গ্রেপ্তার ও থানায় নিয়ে যাওয়া নিয়ে সেখানে উত্তেজনা তৈরি হয় বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। হট্টগোলের মধ্যেই একপর্যায়ে আসির মিয়া পুলিশের হেফাজত থেকে বেরিয়ে যান। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তখন তাঁর হাতে হাতকড়া ছিল।
ঘটনার পর আরও আলোচনার জন্ম দেয় আসির মিয়ার ফেসবুক লাইভ। পুলিশের হেফাজত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারে আসেন। লাইভে তাঁর এক হাতে হাতকড়া দেখা যায়। সেখানে তিনি নিজের অবস্থান তুলে ধরেন এবং পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।
ফেসবুক লাইভে আসির মিয়া দাবি করেন, শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশে এসআই নুর উদ্দিনের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁর ওপর হামলা করেন এবং তাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি আরও দাবি করেন, গ্রেপ্তারের কারণ জানতে চেয়ে এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখতে চাইলেও পুলিশ তাঁকে তা দেখায়নি। তবে এসব বক্তব্য আসির মিয়ার নিজস্ব দাবি; এর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অন্যদিকে পুলিশ বলছে, আসির মিয়া একটি মামলার আসামি ছিলেন এবং তাকে আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে থানায় নেওয়ার সময় ঘটনাস্থলে কিছু নারীসহ স্থানীয় লোকজন হইচই ও ঝামেলা সৃষ্টি করেন। সেই পরিস্থিতির সুযোগে আসির মিয়া পালিয়ে যান।
শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. অলিউল্লাহ জানিয়েছেন, পুলিশের হেফাজত থেকে একজন আসামি পালিয়ে গেছেন এবং তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে হাতকড়া নিয়ে পালানোর বিষয়টি নিয়ে পুলিশের বক্তব্যে কিছুটা ভিন্নতা পাওয়া গেছে। তাঁর ভাষ্য, একজন কর্মকর্তা নিয়মিত মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করার পর কয়েকজন নারী সেখানে ঝামেলা সৃষ্টি করেন এবং সেই সুযোগে আসামি পালিয়ে যান।
ঘটনার পর আসির মিয়াকে পুনরায় গ্রেপ্তারে শান্তিগঞ্জ থানা-পুলিশের একাধিক দল বিভিন্ন এলাকায় অভিযান ও তল্লাশি শুরু করেছে। তবে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আজির উদ্দিন ঘটনাটি সম্পর্কে বলেন, তিনি পুলিশি অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না। পরে তিনি জানতে পারেন, হইচইয়ের মধ্যে আসির মিয়া পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে গেছেন। স্থানীয়দের মধ্যে ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
আসির মিয়ার বিরুদ্ধে কোন মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়েও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। কিছু প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে ডাকাতির মামলার কথা বলা হয়েছে। আবার অন্য একটি প্রতিবেদনে পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের বরাতে বলা হয়েছে, তিনি মারামারির মামলার আসামি। ফলে মামলার প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত তাঁকে নির্দিষ্ট কোনো মামলার আসামি হিসেবে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ না করাই নিরাপদ।
তবে স্থানীয় ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আসির মিয়া এবং তাঁর দুই ভাই নাছির মিয়া ও বাচ্ছু মিয়ার বিরুদ্ধে দামোধরতপী গ্রামের বাসিন্দা মো. জিয়াউল হক বেগ অভিযোগ করেছিলেন—এমন তথ্যও এসেছে। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে আসির মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মামলার নথি বা অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া না যাওয়ায় অভিযোগের প্রকৃত ধরন ও এর আইনগত অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
ঘটনাটির সবচেয়ে আলোচিত দিক হয়ে উঠেছে পুলিশের হেফাজত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আসামির হাতকড়া পরা অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে আসা। সাধারণত পুলিশি হেফাজতে থাকা কোনো আসামির নিরাপত্তা ও পাহারা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সেই অবস্থায় একজন আসামি কীভাবে হেফাজত থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারে আসতে পারলেন, তা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
একই সঙ্গে আসির মিয়ার লাইভে করা অভিযোগও তদন্তের দাবি রাখে। তিনি পুলিশি আচরণ নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, আইনগত প্রক্রিয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং স্থানীয় লোকজনের সৃষ্ট হট্টগোলের সুযোগে তিনি পালিয়ে যান। ফলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে পুলিশের অভিযান, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মামলার নথি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিক থেকেও ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো আসামিকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া বা হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্তকেই প্রভাবিত করে না, বরং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় পর্যায়ে আইন সম্পর্কে মানুষের মনোভাব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। একইভাবে কোনো আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও আদালতে তার বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে তাকে দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না।
বর্তমানে পুলিশের প্রধান লক্ষ্য আসির মিয়াকে পুনরায় আটক করা এবং ঘটনার পুরো পরিস্থিতি পরিষ্কার করা। তিনি কীভাবে পুলিশের হেফাজত থেকে বেরিয়ে গেলেন, সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন এবং কেউ তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে পুলিশের কাছ থেকে সরিয়ে নিতে সহযোগিতা করেছে কি না—এসব বিষয় তদন্তে উঠে আসতে পারে।
এদিকে হাতকড়া পরা অবস্থায় আসির মিয়ার ফেসবুক লাইভের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় ঘটনাটি দ্রুত মানুষের নজরে এসেছে। একদিকে পুলিশের হেফাজত থেকে আসামি পালানোর ঘটনা, অন্যদিকে পালিয়ে যাওয়ার পর তাঁর প্রকাশ্য লাইভ—দুই ঘটনাই স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, আসির মিয়াকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাঁকে পুনরায় আটক করা গেলে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলার আইনগত প্রক্রিয়া এবং পুলিশের হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনার পরবর্তী ব্যবস্থা সম্পর্কে আরও স্পষ্টতা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি ফেসবুক লাইভে করা অভিযোগগুলোরও আইনগতভাবে যাচাই হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।


