প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি, অবকাঠামো ধ্বংস এবং হাজারো মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবি জোরালো করেছে নেপাল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নে তুলনামূলকভাবে কম অবদান রাখা নেপালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে, তার জন্য বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলোর দায়িত্ব রয়েছে।
নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যাকে কেন্দ্র করে দেশটি চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করেছে। কাঠমান্ডুর অবস্থান হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দুর্যোগপ্রবণ ও স্বল্প-নির্গমনকারী দেশগুলোকে কেবল মানবিক সহায়তা দেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং ক্ষয়ক্ষতির জন্য ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
২৬ আগস্ট নেপালের ভোতেকোশি নদী অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যা ও আকস্মিক পানির স্রোত আঘাত হানে। এর প্রভাবে রাশুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিংসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা এক হাজারের বেশি এবং নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় চার হাজারের কাছাকাছি বলে জানানো হয়েছে। নেপালের সর্বশেষ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ১১৪ এবং নিখোঁজ ৩ হাজার ৯১৬ জন।
দুর্যোগের ভয়াবহতা এতটাই বেশি যে নেপালের একটি সীমান্তবর্তী জনপদ থেকে শুরু করে নদীর নিম্ন অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো এখনো নিখোঁজদের সন্ধানে কাজ করছে। হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করছেন এবং বহু পরিবার প্রিয়জনের সন্ধানে অপেক্ষা করছে। উদ্ধারকাজে নেপাল পুলিশ, সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২১ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
দুর্যোগের কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে নেপাল-চীন সীমান্তের উচ্চ পার্বত্য এলাকায় পাথর, বরফ ও হিমবাহ-সংক্রান্ত একটি বড় ধসের কথা বলা হয়েছে। সেই ধসের ফলে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নদীপথে নেমে এসে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। তবে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, এই দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি নির্ধারিত হয়নি এবং কারণ নির্ধারণে আরও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
তবে নেপালের সরকার ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছে, হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশ, হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে এ ধরনের দুর্যোগের সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ পার্বত্য অঞ্চল হিসেবে হিমালয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহের পরিবর্তনের ফলে সেখানে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটেই নেপাল তার কূটনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, দেশটির কূটনৈতিক কাঠামোকে সহায়তা-কেন্দ্রিক অবস্থান থেকে ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দিকে নেওয়া হচ্ছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নেপালের দাবি দাতব্য সহায়তার জন্য নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে নৈতিক ও দায়িত্বশীল প্রতিক্রিয়ার জন্য।
নেপালের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বহুল আলোচিত ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ক্ষয়ক্ষতির অর্থায়ন প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যেসব দেশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাদের পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নেপালও জাতিসংঘ-সমর্থিত ‘ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ’-এর কাছে জরুরি আর্থিক সহায়তার আবেদন করেছে।
এদিকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র ‘বালেন’ শাহকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে পাঠানোর বিষয়টি নিয়েও আলোচনা চলছে। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নেপালের ক্ষয়ক্ষতি এবং ক্ষতিপূরণের দাবি সরাসরি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সেপ্টেম্বরেই নিউইয়র্কে শুরু হওয়ার কথা।
নেপালের অর্থনীতির ওপরও এই দুর্যোগের বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বন্যায় সীমান্তবর্তী এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে জানিয়েছেন, দুর্যোগের পর পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এই অর্থ নেপালের অর্থনীতির প্রায় এক-দশমাংশের সমান।
জলবিদ্যুৎ খাতের ক্ষতি নেপালের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ। দেশটির অর্থনীতিতে জলবিদ্যুতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এবং বিভিন্ন প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটন, স্থানীয় ব্যবসা, যোগাযোগ এবং সীমান্ত বাণিজ্যেও দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে।
বন্যার পর আন্তর্জাতিক সহায়তাও আসতে শুরু করেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ৫ মিলিয়ন ডলারের অনুদান অনুমোদন করেছে। খাদ্য, নিরাপদ পানি, আশ্রয়, ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজন মেটাতে এ অর্থ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
তবে নেপাল এখন যে প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলছে, তা কেবল জরুরি ত্রাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির দাবি, বারবার জলবায়ুজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় বড় ধরনের অর্থায়ন প্রয়োজন। এ অর্থায়নের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনে বেশি অবদান রাখা দেশগুলোর দায়িত্বকে সামনে আনা উচিত বলে মনে করছে কাঠমান্ডু।
চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছে নেপাল। তবে এই দাবির সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতির একটি জটিল বিতর্কও জড়িয়ে আছে। মোট নির্গমনের পরিমাণের পাশাপাশি মাথাপিছু নির্গমন, ঐতিহাসিক নির্গমন, শিল্পায়নের সময়কাল এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা উচিত—এমন অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশের আলোচনায় রয়েছে।
বিশেষ করে ভারতের ক্ষেত্রে মোট নির্গমন বেশি হলেও দেশটি বারবার বলেছে, জলবায়ু দায় নির্ধারণের সময় শুধু বর্তমান মোট নির্গমন দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। মাথাপিছু ও ঐতিহাসিক নির্গমন এবং উন্নত দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়ার ওপরও ভারত জোর দিয়ে আসছে। ফলে নেপালের ক্ষতিপূরণের দাবি সামনে এলে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় এই পুরোনো বিতর্কও নতুন করে জোরালো হতে পারে।
অন্যদিকে নেপালের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নিখোঁজ মানুষদের সন্ধান, আহতদের চিকিৎসা, বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয় এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার। ভয়াবহ এই দুর্যোগে অনেক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ও জীবিকার উৎস হারিয়েছে। কেউ প্রিয়জনের সন্ধানে অপেক্ষা করছেন, আবার কেউ এক মুহূর্তে হারিয়ে যাওয়া বসতভিটায় ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন।
দুর্যোগের তাৎক্ষণিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠলেও নেপালের সামনে এখন দীর্ঘ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বসতবাড়ি ও জনসেবা অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে আগাম সতর্কতা, হিমবাহ পর্যবেক্ষণ এবং পাহাড়ি অঞ্চলের অবকাঠামো পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে।
নেপালের এই ক্ষতিপূরণের দাবি তাই শুধু একটি দেশের আর্থিক প্রয়োজনের প্রশ্ন নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর ন্যায়বিচারের দাবিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্ব উষ্ণায়নে কার কতটা দায় এবং সেই দায়ের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো কী ধরনের সহায়তা পাওয়ার অধিকার রাখে—এই বিতর্ক আগামী দিনগুলোতে আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোতেকোশি নদীর বন্যায় নেপালের যে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে, তার ক্ষত সারাতে সময় লাগবে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর শুরু হবে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কঠিন অধ্যায়। সেই বাস্তবতায় নেপাল এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে শুধু সহানুভূতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবিও তুলে ধরছে। আর এই দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হতে পারে আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন।


